আজ পহেলা বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রকাশিত: ৫:০৩ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ১৪, ২০২৬

আজ পহেলা বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Manual5 Ad Code

নিউজ ডেস্ক :: আজ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের প্রথম দিন- বাংলা নববর্ষ। বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখে নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে দেশজুড়ে উৎসবের আমেজ। লাল-সাদা পোশাক, বৈশাখী শোভাযাত্রা, পান্তা-ইলিশ আর ‘এসো হে বৈশাখ’ গানের সুরে মুখর হয়ে উঠবে পুরো বাংলাদেশ। এই উৎসব শুধু আনন্দের নয়, বরং বাঙালির ঐক্য, সংস্কৃতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ- যা আজকের দিনে গণতান্ত্রিক চেতনাকেও নতুন করে জাগ্রত করে।

Manual2 Ad Code

এই চেতনা থেকেই সরকারিভাবে এবারের পহেলা বৈশাখের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে- ‘নববর্ষের ঐক্যতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’। নববর্ষকে বরণ করতে আয়োজনের যেন কোনো শেষ নেই। রাজধানীর রমনা বটমূলে ছায়ানটের সম্মিলিত সংগীত পরিবেশনায় নতুন বছরের সূর্যোদয়ের সঙ্গে জেগে ওঠে বাঙালির চৈতন্য। ছায়ানট ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন নিজ নিজ উদ্যোগে নববর্ষ উদযাপনের আয়োজন করে। এই সম্মিলিত আয়োজনই নববর্ষকে পরিণত করে এক সর্বজনীন মিলনমেলায়- যেখানে ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি-পেশা নির্বিশেষে সবাই একসঙ্গে যুক্ত হয়।

বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে যেমন উৎসব রয়েছে, তেমনি রয়েছে সংগ্রাম ও ঐক্যের গল্প। সেই ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল ও সর্বজনীন রূপ পহেলা বৈশাখ। নববর্ষকে ঘিরে বসে হরেক রকম মেলা, যার প্রাণভোমরা বৈশাখী মেলা। মেলা মানেই মিলন- মানুষে মানুষে হৃদয়ের আদান-প্রদান, সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করা। এ মিলনমেলা মূলত গণমানুষের অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা এক সামাজিক গণতন্ত্রের প্রতিচ্ছবি।

প্রখ্যাত সাহিত্যিক আবুল ফজল নববর্ষ ও মেলাকে দেখেছেন বাঙালির আত্মপরিচয়ের উৎস হিসেবে। তার মতে, পহেলা বৈশাখ বাঙালির প্রকৃত মুক্তির দিন- যা কোনো সাম্প্রদায়িক গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়। তিনি একে বাঙালির জয়যাত্রা হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার ভাষায়, ‘ধর্ম যার যার, মেলা সবার’- এই চেতনার মধ্যেই নিহিত রয়েছে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক সমাজের ভিত্তি।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘স্বদেশ সমাজ’ প্রবন্ধে মেলার তাৎপর্য তুলে ধরে লিখেছেন- ‘আমাদের দেশ প্রধানতঃ পল্লীবাসী। এই পল্লী মাঝে মাঝে আপনার বাড়ির মধ্যে বাহিরের বৃহৎ জগতের রক্ত চলাচল অনুভব করিবার জন্য উৎসুক হইয়া ওঠে। তখন মেলাই তাহার প্রধান উপায়। এই মেলায় আমাদের দেশে বাহিরকে ঘরের মধ্যে আহ্বান করে। হৃদয় খুলিয়া দান গ্রহণ করিবার এই প্রধান উপায়।’

ইতিহাস বলছে, তখন ভারত উপমহাদেশে প্রশাসনিক কাজে ব্যবহার হতো ইসলামি হিজরি অনুসরণে। এর ভিত্তি ছিল চান্দ্রমাসের হিসাব। কিন্তু কৃষিকাজ পুরোপুরি নির্ভর করে ঋতু ও সূর্যের গতিপথের ওপর। ফলে হিজরি সাল অনুযায়ী খাজনা আদায় করতে গিয়ে বড় ধরনের সমস্যায় পড়তেন কৃষকরা। কারণ বছর ঘুরে খাজনা দেওয়া সময় কখনো ফসল ওঠার আগেই চলে আসত।

এ সমস্যা সমাধানের জন্য সম্রাট আকবর একটি নতুন বর্ষপঞ্জি চালুর উদ্যোগ নেন। ১৫৮৪ সালে এটি চালু হয়। তবে এর গণনা শুরু হয় সম্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহণের বছরে, ৫ নভেম্বর ১৫৫৬ সাল থেকে। এই নতুন বর্ষপঞ্জিকে বলা হতো ফসলি সন। আস্তে আস্তে বাংলার কৃষি ও অর্থনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে যে কারণে বাংলা সন বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বাংলা সনের প্রথম দিন নির্ধারণ করা হয় বৈশাখ মাসের প্রথম দিন, যা আজ আমরা পহেলা বৈশাখ নামে উদযাপন করি।

বাংলাদেশে আধুনিক বাংলা বর্ষপঞ্জির সংস্কার শুরু হয় ১৯৬৬ সালে। এই উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকার এই সংস্কারকৃত পঞ্জিকাকেই সরকারি ক্যালেন্ডার হিসেবে গ্রহণ করে।

ইতিহাসের ধারায় দেখা যায়, ১৮৬৪ সালে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে প্রথম জাঁকজমকপূর্ণভাবে নববর্ষ উদযাপনের সূচনা হয়। আধুনিক নাগরিক জীবনে বৈশাখী মেলার বিস্তারে ১৯৭৭ সালের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা বিশেষভাবে স্মরণীয়। সাহিত্যপত্র ‘সমকাল’-এর উদ্যোগে বাংলা একাডেমিতে প্রথম বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়, যেখানে শিল্পী কামরুল হাসান ও লোকসংস্কৃতি গবেষক শামসুজ্জামান খানের অবদান ছিল অনন্য। এই উদ্যোগ নাগরিক জীবনে বৈশাখী মেলাকে নতুন মাত্রা দেয় এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা এক বিশাল সাংস্কৃতিক ধারায় পরিণত হয়।

মেলা নিয়ে কবি জসীমউদ্দীন তার কবিতায় লিখেছেন-
‘রঙিন পালের নাওয়ের মতো মেলা বসেছে গায়,
কত মানুষের ভিড় জমেছে মেঠো পথের গায়…’

Manual7 Ad Code

এই চিত্রই তুলে ধরে গ্রামবাংলার প্রাণময় উৎসবের রূপ। বৈশাখী মেলা মানেই গ্রামবাংলার বিচিত্র কারুপণ্য ও কৃষিজাত দ্রব্যের সমাহার। মাটির তৈরি সানকি, হাঁড়ি-পাতিল, পুতুল, শীতলপাটি, বাঁশের বাঁশি, নকশিকাঁথা- সবকিছুই যেন মেলায় জীবন্ত হয়ে ওঠে। পাশাপাশি রসনাবিলাসের জন্য থাকে চিড়া, মুড়ি, খই, বাতাসা, কদমাসহ নানা ঐতিহ্যবাহী খাবার।

বিনোদনের ক্ষেত্রেও মেলার ভূমিকা অনন্য। লোকগীতি, যাত্রা, পালাগান, কবিগান, গম্ভীরা, গাজীর গান, মারফতি, মুর্শিদি ও ভাটিয়ালি- এসব লোকসংগীতের মাধ্যমে মেলা হয়ে ওঠে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক জীবন্ত মঞ্চ। প্রাবন্ধিক অন্নদাশঙ্কর রায় যথার্থই বলেছেন, বাঙালি তার উৎসবের মধ্য দিয়েই বাঁচে।

বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলেই বৈশাখী মেলা নিজস্ব বৈচিত্র্যে অনুষ্ঠিত হয়- নারায়ণগঞ্জ, সোনারগাঁ, মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, সাভার, রংপুরের পায়রাবন্দসহ বিভিন্ন অঞ্চলে মেলা ভিন্ন ভিন্নরূপে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছু ঐতিহ্য যেমন মোরগের লড়াই, লাঠিখেলা, ঘোড়দৌড় ও ষাঁড়ের দৌড়, ঘুড়ি উড়ানো প্রভৃতি ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। নাগরিক জীবনে পহেলা বৈশাখ এখন অনেকটা নির্দিষ্ট কয়েকটি স্থানে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়লেও রমনা বটমূলে ছায়ানটের ভোরের আয়োজন এখনও মানুষকে টানে।

Manual2 Ad Code

পহেলা বৈশাখ কেবল একটি উৎসব নয়- এটি বাংলাদেশের সর্বজনীন লোক-উৎসব, যেখানে সব সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে অংশগ্রহণ করে। এই সহাবস্থানই আমাদের সামাজিক ঐক্য ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তি। বাংলা নববর্ষ বাঙালির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা কৃষিজীবন থেকে শুরু করে জাতীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করে।

নববর্ষের এদিনে আমাদের প্রত্যাশা- এই উৎসবের মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে পড়ুক অসাম্প্রদায়িকতা, সম্প্রীতি ও গণতান্ত্রিক চেতনা। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়-
‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা,
অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’

Manual3 Ad Code

নববর্ষের ঐক্যতানে জেগে উঠুক নতুন আশা পুনরুত্থান হোক গণতন্ত্রের, শক্ত হোক মানুষের পারস্পরিক বন্ধন।