ঢাকা ২৩শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৯ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৮:৩১ অপরাহ্ণ, মে ২৩, ২০২৬
সিংহবাড়িতে কবি নজরুল : শতবর্ষ স্মরণোৎসব’-আয়োজন উপলক্ষ্যে সাংবাদিকদের সঙ্গে মত বিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল (২৩ মে শনিবার ) বিকেল ৫টায় সিলেট নগরের জিন্দাবাজারস্থ হোটেল গোল্ডেন সিটির করফারেন্স কক্ষে এই মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় স্মরণোৎসবের আয়োজক উপেন্দ্র-বীণাপানি স্মৃতি পরিষদের সভাপতি জ্যোতির্ময় সিংহ মজুমদার চন্দন সাংবাদিকদের উদ্দেশ্য লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন।
লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ২৪ মে রবিবার বিকেল সাড়ে চারটায় আমরা জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সিলেট তথা সিংহবাড়ি আগমনের শতবর্ষ স্মরণোৎসব পালন করতে যাচ্ছি। এ ব্যাপারে আপনাদের সহযোগিতা একান্ত কাম্য। কারণ সাংবাদিকরা কেবল সংবাদ প্রকাশ করেন না, বরং ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। মূলত ঐতিহ্য, চেতনা ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের দায় থেকে মতবিনিময়ের এ আয়োজন। আপনাদের কথা, আপানাদের মূল্যবান পরামর্শ আমাদের অনুষ্ঠান আরো সার্থক হয়ে উঠবে এই প্রত্যাশা।
তিনি বলেন, সিলেটের ঐতিহ্যবাহী ‘সিংহবাড়ি’ তেমনই এক স্মৃতিধন্য স্থান, যেখানে পদধূলি পড়েছিল বাংলা সাহিত্যের দুই মহাতারকা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের।
তাঁদের আগমন কেবল একটি পরিবারের গৌরব নয়; এটি সমগ্র সিলেটবাসীর সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। সেই ঐতিহাসিক স্মৃতিকে ধারণ করে আমার পিতা-মাতার নামে গঠিত ‘উপেন্দ্র-বীণপাণি স্মৃতি পরিষদ’ কর্তৃক আয়োজিত ‘সিংহবাড়িতে কবি নজরুল : শতবর্ষ স্মরণোৎসব’-এর আয়োজন। এটি আমাদের সাহিত্য-ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক চেতনাকে ধারণ করার ঐকান্তিক প্রয়াস।
কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের জাতীয় কবি। তাঁর কবিতা, গান, প্রবন্ধ ও জীবনদর্শন যুগে যুগে মানুষের হৃদয়ে স্বাধীনতা, সাম্য ও মানবতার বাণী ছড়িয়ে দিয়েছে। তিনি যেমন বিদ্রোহের কবি, তেমনি প্রেম, সৌন্দর্য, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও মানবমুক্তির কবিও।
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন প্রযুক্তির অগ্রগতি মানুষের জীবনকে সহজ করলেও সংস্কৃতি ও ইতিহাস থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। নতুন প্রজন্মের বড় একটি অংশ নিজেদের সাহিত্যিক ঐতিহ্য সম্পর্কে খুব কম জানে। তাদের কাছে নজরুল হয়তো কেবল পাঠ্যবইয়ের একটি অধ্যায়। অথচ তাঁর সাহিত্য ও সংগীতে যে দ্রোহ, প্রেম, সাম্য ও মানবতার শিক্ষা নিহিত আছে, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
সাংস্কৃতিক পরিম-ল বর্তমানে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে। বাণিজ্যিক বিনোদনের চাপে শুদ্ধ সাহিত্য ও সংগীতচর্চা অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় স্থানীয় পর্যায়ে সাহিত্য-সংস্কৃতিভিত্তিক আয়োজনগুলো সমাজকে নতুন করে ভাবতে শেখায়।
বিশ্বজুড়ে যখন ধর্মীয় বিভাজন, সহিংসতা ও অসহিষ্ণুতা বাড়ছে, তখন নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চেতনা নতুন করে আমাদের সামনে পথ দেখায়। তাই নজরুল স্মরণোৎসব-সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সম্প্রীতিরও এক ঐক্যের বার্তা।
সিংহবাড়ির সঙ্গে কবি নজরুলের সম্পর্ক গভীর মানবিকতাতেও ভরপুর। ১৯২৬ সালে অসুস্থ অবস্থায় তিনি যখন সিলেটে অবস্থান করেন, তখন সিংহবাড়ির সদস্যদের আন্তরিক সেবা ও ভালোবাসা তাঁকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। সেই সম্পর্কের উজ্জ্বল সাক্ষী হয়ে আছে সিংহবাড়ির কন্যা লীলাবতী মজুমদারের উদ্দেশে লেখা তাঁর হৃদয়ছোঁয়া কবিতা। আমার আপন জ্যেঠ্তুতো বোন লীলাবতী মজুমদারের সুরেলা কণ্ঠে গান শুনে কাজী নজরুল ইসলাম বিমোহিত হন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে তাৎক্ষণিক কবি লেখেন-
‘তোমার কণ্ঠে বাঁধিয়াছে নীড় সুরের দেশের পাখি-
সুরেশ্বরের হস্তে বাঁধুক তোমার সুরের রাখী।
উষসীর বাণী এনেছো বহিয়া আকুল কণ্ঠে পুরে
ফুলঝুরি সম তৃষিত ধরায় পড়–ক তাহাই ঝরে।
হেম-গিরি তলে কাঁদে যে নিঝর
প্রকাশের পথ খুঁজি,
তোমার কণ্ঠে শুমরিছে আজো তারি আকুলতা বুঝি!
যে পূব-হাওয়ায় আঁখি খোলে কেয়া, শিহরিয় নীপ-বনে,
সেই বাতাসের বাজিছে আভাস তোমার গুঞ্জরণে।
তুমি আনিয়াছ সুরধুনী ছানি যে-সুরের রূপলীলা
তারি রঙে তুমি অশ্রুর মেঘে করো নিতি রঙ্গিলা।
শ্রীহট্ট : ৭ কার্তিক ১৩৩৫
এই প্রসঙ্গে সিলেটের কীর্তিমান গবেষক কবি নৃপেন্দ্রলাল দাশ কর্তৃক প্রকাশিত ‘নিজের নজরুল’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে-
‘১৯২৬ সালে নজরুল যখন সিলেট এসে বসন্ত রোগে আক্রান্ত হন। তখন সুধীরেন্দ্র নারায়ণ সিংহ মজুমদার তাঁর সেবা করেছিলেন আন্তরিকভাবে। এই পরিবারের সন্তান লীলাবতীকে নজরুল একটি কবিতা লিখে দেন। ‘সুররাখী’ নামে পত্রিকায় চৈত্র সংখ্যায় এবং শ্রীহট্ট সাহিত্য পরিষদ পত্রিকায়ও কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছিল। নজরুল একাডেমি পত্রিকা’র হেমন্ত ১৩৭৬ সংখ্যায় দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ লিখেছেন, ‘লীলা নামে একটি মেয়ে নজরুলের গানের মস্ত বড় ভক্ত। নজরুল তাকে অনেকগুলো গানও শিখিয়েছিলেন। তাঁকে নিয়ে একটি কবিতাও লেখেন। ‘আবদুল কাদির সম্পাদিত নজরুল সম্ভার গ্রন্থে কবিতাটি সংকলিত হয়েছিল।’
সাহিত্য জগৎ-এর দুই দিকপাল কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কাজী নজরুল ইসলাম ‘সিংহ বাড়ি’তে শুভ পদার্পণের কারণে আমার দাদামহাশয় গোবিন্দ নারায়ণ সিংহ, তাঁর তিনপুত্র গোপেন্দ্র, উপেন্দ্র এবং সুধীরেন্দ্র নারায়ণ সিংহ মজুমদার (আমার জ্যেঠামহাশয়, বাবা ও কাকা)-সহ পূর্বসূরীদের ওপর দারুণ প্রভাব বিস্তার করে। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল এই দুই মহাকবির সিংহবাড়ি আগমন একটি পরিবারের সাংস্কৃতিক জাগরণেও বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। পরিবারের উত্তরসূরিরা সাহিত্য, সংগীত ও সংস্কৃতিচর্চায় নিজেদের যুক্ত রেখেছেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম। এ ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মহান কবি বা শিল্পীর সংস্পর্শ কেবল মুহূর্তের আবেগ নয়, তা একটি পরিবার কিংবা সমাজের সাংস্কৃতিক সম্পত্তি।
জ্যোতির্ময় সিংহ মজুমদার চন্দন বলেন, ‘আমি অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত যে, ইংল্যান্ডের নটিংহ্যাম প্রবাসী ‘সিংহ বাড়ি’র কৃতী সন্তান, আমার আপন ভাতিজি ড. শর্মিলা সেন একজন প্রতিভাবান নজরুল ও উচ্চাঙ্গসংগীত শিল্পী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। ‘উপেন্দ্র-বীণাপাণি’ স্মৃতি পরিষদ কর্তৃক আয়োজিত ‘সিংহবাড়িতে কবি নজরুল : শতবর্ষ স্মরণোৎসব’ অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে ড. শর্মিলা সেন, তার স্বামী বিশিষ্ট তবলাবাদক ড. অরিজৎ সেন, তাদের একমাত্র কন্যা আনন্দী সেন ও এককমাত্র পুত্র অনিরুদ্
অনিরুদ্ধ সেন-এর পরিবেশনা আশাকরি সবাইকে আনন্দ দেবে।
‘সিলেটের সংগীত জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র, প্রবীণ নজরুল সংগীতশিল্পী শ্রী হিমাংশু বিশ্বাসসহ অন্যান্য সংগীত শিল্পীবৃন্দ, বাচিকশিল্পীবৃন্দ ছাড়াও নজরুল অনুরাগী বিশিষ্টজনেদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানের ঔজ্জ্বল্য বৃদ্ধি করবে সন্দেহ নেই। সকলকে অকুণ্ঠ চিত্তে সাধুবাদ জানাচ্ছি।
সিংহবাড়িতে কবি নজরুল : শতবর্ষ স্মরণোৎসব উপরক্ষ্যে একটি স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করা হচ্ছে। স্মারকগ্রন্থ প্রকাশের দায় ও দায়িত্ব দুটিই কঠিন। কারণ ইতিহাস যদি লিপিবদ্ধ না হয়, তবে তা সময়ের স্রোতে হারিয়ে যায়। গবেষক, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিবিদদের লেখা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মূল্যবান দলিল হয়ে থাকে। বিশেষ করে নজরুলের সিলেট-সংযোগ, তাঁর ব্যক্তিগত স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক প্রভাব নিয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন। কারণ আমাদের সাহিত্য ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক স্মৃতি এখনও অনালোচিত রয়ে গেছে।
‘সিংহবাড়িতে কবি নজরুল : শতবর্ষ স্মরণোৎসব’ অনুষ্ঠান পালন উপলক্ষ্যে মুদ্রিত স্মারক পুস্তিকায় অনেক বিদগ্ধজন স্বল্প সময়ের মধ্যে প্রবন্ধ লিখে দিয়ে পুস্তিকাটির মান-মর্যদা বৃদ্ধি করেছেন। এছাড়াও পুস্তিকাটির নামকরণ সহ ‘সিংহবাড়িতে কবি নজরুল : শতবর্ষ স্মরণোৎসব’ সফলতায় লেখক ও শিক্ষক অনুজপ্রতিম সঞ্জয় কুমার নাথ সহ যাঁরা নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন তাঁদেরে অকুণ্ঠ চিত্তে সাধুবাদ জানাই।
সব শেষে জ্যোতির্ময় সিংহ মজুমদার চন্দন বলেন, আজ একান্ত বাসনা-এ ধরনের উদ্যোগ দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ুক। সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো সংরক্ষণ করা হোক। নতুন প্রজন্মকে শেকড়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র একসঙ্গে কাজ করুক। কারণ রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল কেবল অতীতের কবি নন; তাঁরা আমাদের বর্তমানের প্রেরণা এবং ভবিষ্যতের আলোকবর্তিকা।
সাংবাদিক সম্মেলনে সিলেটের প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিকস মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। ‘সিংহবাড়িতে কবি নজরুল : শতবর্ষ স্মরণোৎসব’-আয়োজক কমিটির পক্ষে উপস্থিত ছিলেন-শিক্ষক ও লেখক সঞ্জয় কুমার নাথ, সমাজসেবি শিলা সাহা, বাচিকশিল্পী শাশ্বতী ঘোষ সোমা, শিল্পী জয়তী ঘোষ লুনা।
Design and developed by sylhetalltimenews.com