সিলেটে ভিক্ষুকের উপদ্রব: অতিষ্ঠ নগরবাসী ও পর্যটক, জিন্দাবাজার যেন ভিক্ষুকের রাজধানী

প্রকাশিত: ১২:০৩ অপরাহ্ণ, জুন ২৫, ২০২৬

সিলেটে ভিক্ষুকের উপদ্রব: অতিষ্ঠ নগরবাসী ও পর্যটক, জিন্দাবাজার যেন ভিক্ষুকের রাজধানী

Manual1 Ad Code

শিপন আহমদ:

Manual4 Ad Code

আধ্যাত্মিক নগরী ও অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র সিলেটে সাম্প্রতিক সময়ে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে ভিক্ষুকের উপদ্রব। নগরীর প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়, শপিংমল, ধর্মীয় উপাসনালয় এবং বিনোদন কেন্দ্রের সামনে ভিক্ষুকদের দলবদ্ধ অবস্থান এখন নিত্যদিনের চিত্র। তাদের জোরাজুরি আর অতিরিক্ত পিড়াপিড়িতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকরা।

জিন্দাবাজার যেন ভিক্ষুকের ‘রাজধানী’
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নগরীর ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকা জিন্দাবাজার এখন ভিক্ষুকদের প্রধান আস্তানায় পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের মতে, শুধু জিন্দাবাজার এলাকাতেই অন্তত তিন শতাধিক ভিক্ষুক নিয়মিত অবস্থান করে। এখানকার নামী-দামি শপিংমল, অভিজাত রেস্তোরাঁ ও মিষ্টির দোকানগুলোর সামনে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে তাদের রাজত্ব। কোনো ক্রেতা বা দর্শনার্থী দোকান থেকে বের হলেই ঝাঁক বেঁধে ঘিরে ধরে ভিক্ষুকরা। অনেক সময় টাকা না দেওয়া পর্যন্ত পথ আগলে দাঁড়িয়ে থাকার মতো বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় সাধারণ মানুষকে।

Manual3 Ad Code

পুরো নগরীজুড়ে ভিক্ষুকদের ‘রাজত্ব’
শুধু জিন্দাবাজারই নয়, ভিক্ষুকদের এই সিন্ডিকেটের বিস্তার ঘটেছে পুরো সিলেট নগরীতে। বন্দরবাজার, ঐতিহাসিক ক্বীন ব্রিজের মুখ, সুরমা মার্কেট পয়েন্ট, চৌহাট্টা, শিবগঞ্জ, আম্বরখানা, শাহজালাল উপশহর ও সোবহানীঘাটে ভিক্ষুকদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।
তাছাড়া, পর্যটক ও সাধারণ যাত্রীদের যাতায়াতের প্রধান কেন্দ্রস্থল—ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকা, কদমতলী পয়েন্ট, কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল, রেলওয়ে স্টেশন এবং হুমায়ূন রশীদ চত্বরে চব্বিশ ঘণ্টাই ভিক্ষুকদের আনাগোনা থাকে। ধর্মীয় আবেগ ও পর্যটকদের ভিড়কে কাজে লাগিয়ে হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার এলাকায় ভিক্ষাবৃত্তিকে রীতিমতো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে।

পর্যটকদের নেতিবাচক অভিজ্ঞতা
দুটি পাতা একটি কুঁড়ির দেশ সিলেটকে দেখতে প্রতি বছর লাখো পর্যটক আসেন। কিন্তু নগরীতে পা রাখতেই ভিক্ষুকদের এমন উপদ্রব সিলেটের সুনাম ও পর্যটন শিল্পকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করছে। ঢাকা থেকে আসা এক পর্যটক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, *”মাজার জিয়ারত বা শপিংমলে শান্তিতে দাঁড়ানোর উপায় নেই। একজন বা দুজন হলে তাও সাহায্য করা যায়, কিন্তু একসাথে ৫-১০ জন এসে যেভাবে জামা কাপড় টেনে ধরে, তাতে পরিবার নিয়ে চরম অস্বস্তিতে পড়তে হয়।

Manual1 Ad Code

পুঁজিহীন ‘সহজ ব্যবসা’ ও সুস্থ-সবলদের ভিড়
সরেজমিনে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এই ভিক্ষুকদের বড় একটি অংশই শারীরিক ও মানসিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ-সবল। অনেক কর্মক্ষম যুবক, যুবতী এবং সুস্থ নারী-পুরুষ কোনো কাজ না করে ভিক্ষাবৃত্তিকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, কোনো পুঁজি বা শ্রম ছাড়াই সহজে টাকা আয়ের সহজ মাধ্যম হওয়ায় অনেকে একে লাভজনক ‘ব্যবসা’ বানিয়ে ফেলেছে। এমনকি দেশের বিভিন্ন দূরবর্তী অঞ্চল থেকেও একটি নির্দিষ্ট চক্রের মাধ্যমে ভিক্ষুকদের সিলেটে এনে বিভিন্ন পয়েন্টে বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নগরবাসী ও ব্যবসায়ীদের দাবি, এই ভিক্ষুক সিন্ডিকেটের কারণে সিলেটের স্বাভাবিক সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে এবং অপরাধ প্রবণতা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। প্রকৃত অসহায় ও প্রতিবন্ধীদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে, এই সুস্থ-সবল পেশাদার ভিক্ষুকদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, পর্যটন নগরী হিসেবে সিলেটের যে ঐতিহ্য ও সুনাম রয়েছে, তা অচিরেই ম্লান হয়ে যাবে।

Manual2 Ad Code

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ