দিল্লিতে দূতকে তলব, কড়া প্রতিক্রিয়া ঢাকার

প্রকাশিত: ৮:৩৩ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৮, ২০২৫

দিল্লিতে দূতকে তলব, কড়া প্রতিক্রিয়া ঢাকার

Manual8 Ad Code

বাংলাদেশ বিষয়ে উদ্বেগ জানাতে নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত হাইকমিশনারকে তলবের ঘটনাকে ভালোভাবে নেয়নি ঢাকা। অত্যাসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেমন হওয়া উচিত? তা নিয়ে নয়াদিল্লির আগবাড়িয়ে পরামর্শ প্রদান নিয়েও ক্ষুব্ধ বাংলাদেশ সরকার। এ নিয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। বুধবার দুপুরে বাংলাদেশ দূতকে সাউথ ব্লকে তলব এবং পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে দিল্লির বিদেশ মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন। এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, সর্বশেষ যে বক্তব্য (ভারতের তরফে) এসেছে, তাতে আমাদের নসিহত করা হয়েছে। সেটার কোনো প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। আমরা কী করবো? আমরা এমন একটা নির্বাচন করবো, যেখানে মানুষ ভোট দিতে পারবে। যাদের ভোট দেবে, তারাই নির্বাচিত হবে, যেটা এর আগে গত ১৫ বছরে ঘটেনি। নয়াদিল্লির বক্তব্য নিয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা আরও বলেন, নির্বাচন নিয়ে আমরা তাদের কোনো নসিহত গ্রহণ করতে পারি না। কারণ গত ১৫ বছর তারা এমন সেন্টিমেন্ট দেখায়নি। হঠাৎ করে ভারত কেন এমনটা চেয়ে বসলো? সেই প্রশ্নও রাখেন উপদেষ্টা।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের বক্তব্যের সঙ্গে ভারতের বক্তব্যের তুলনাকে নাকচ করেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। এ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি খোলাসা করেই বলেন, দুইটার তুলনা হয় না। নির্বাচন নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ সব সময়ের। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গেও তাদের (ইইউ’র) যোগাযোগ আছে। উপদেষ্টা বলেন, আমরা চাই ইইউ এখানে তাদের অবজারভারদের (নির্বাচন পর্যবেক্ষক) পাঠাক। নির্বাচন বিষয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন- এই সরকার ডে ওয়ান থেকে স্পষ্টভাবে বলে আসছে যে, আমরা একটা অত্যন্ত উচ্চমানের, মানুষ যেন গিয়ে ভোট দিতে পারে, সেই পরিবেশ সৃষ্টি করতে চাই। যে পরিবেশ গত ১৫ বছর ছিল না। এখন ভারত আমাদের এটা নিয়ে উপদেশ দিচ্ছে, এটা আমি সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য মনে করি। এই ‘অগ্রহণযোগ্য’ মনে করার কারণ ব্যাখ্যা করে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা আরও বলেন, তারা জানে যে গত ১৫ বছর ধরে যে সরকার ছিল, যে সরকারের সঙ্গে তাদের অত্যন্ত মধুর সম্পর্ক ছিল, তখন কিন্তু এই যে নির্বাচনগুলো প্রহসনমূলক হয়েছে, তখন তারা একটি শব্দও উচ্চারণ করেনি। এখন সামনে একটা ভালো নির্বাচনের দিকে আমরা যাচ্ছি, এই মুহূর্তে আমাদেরকে নসীহত করার তো কোনো প্রয়োজন নেই। আমরা জানি আমরা কী করবো।

সম্পর্কে টানাপড়েন আছে- স্বীকার করলেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা:

Manual8 Ad Code

এদিকে ভারতের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সম্পর্কে ‘টানাপড়েন আছে’ বলে স্বীকার করেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বুধবার যেভাবে দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশ হাইকমিশনারকে ডেকে পাঠিয়েছে, সেটি ‘খুব অপ্রত্যাশিত কিছু না’ বলে মনে করেন তিনি। বুধবার বিকেলে ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিংয়ে মি. হোসেন বলেন- এটা সাধারণত ঘটে। একজনকে ডাকলে আরেকজনকে ডাকা হয়। এই সরকারের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ভারতের সঙ্গে (সম্পর্কে) টানাপড়েন থাকার কথা স্বীকার করে উপদেষ্টা বলেন- ‘সম্পর্কের এই টানাপড়েন’ মেনে নিয়েই বর্তমান সরকার ভারতের সঙ্গে একটা ভালো সম্পর্ক তৈরি করার চেষ্টা করছে। কিন্তু আমরা চাইলেই যে হবে, এমন কোনো কথা নেই। দুইপক্ষ থেকেই সম্পর্ককে এগোনোর চেষ্টা করতে হবে।

Manual4 Ad Code

কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী বাংলাদেশের ভূমিতে আশ্রয় পাবে না:

Manual8 Ad Code

ওদিকে ভারতের ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীকে’ বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়ার হুমকি দিয়ে সম্প্রতি জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ যে বক্তব্য দিয়েছেন, সে বিষয়ে বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। বুধবার বিকেলে ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মি. হোসেন বলেন, কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আমাদের ভূমিতে আশ্রয় দেবো, এই সরকার অবশ্যই সেটা করবে না। এবং আমি অনুমান করি যে বাংলাদেশের কোনো সরকারই করবে না। এটা একজন অ্যাক্টিভিস্ট-রাজনীতিক বলতে পারেন, তবে সরকারের অবস্থান অবশ্যই সেটা নয়। প্রসঙ্গত, সোমবার ঢাকার শহীদ মিনারে আয়োজিত একটি সভায় হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, ভারতকে স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, যারা আমারদেশের সার্বভৌমত্বকে বিশ্বাস করে না, যারা আমার দেশের সম্ভাবনাকে বিশ্বাস করে না, যারা ভোটাধিকারকে- মানবাধিকারকে বিশ্বাস করে না, যারা এ দেশের সন্তানকে বিশ্বাস করে না, আপনারা (ভারত) যেহেতু তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন, কথা স্পষ্ট করে বলে দিতে চাই ভারতের যারা সেপারেটিস্ট আছে, বাংলাদেশে আমরা তাদের আশ্রয়-প্রশয় দিয়ে যে সেভেন সিস্টার্স আছে সেটাকে ভারতে থেকে আলাদা করে দেবো।
পাল্টাপাল্টি: বুধবার স্থানীয় সময় দুপুর ১২টার দিকে বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহকে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডেকে নেয়া হয়। এ সময় বাংলাদেশ  ও মিয়ানমার দেখভালের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব বি শ্যাম বাংলাদেশ দূতের সঙ্গে কথা বলেন। গত রোববার ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়েছিল। তিনদিনের মাথায় নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনারকে তলব করা হলো। এদিকে বুধবারই ‘চলমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির’ বিষয়টি বিবেচনায় বেলা দুইটা থেকে রাজধানীর যমুনা ফিউচার পার্কে অবস্থিত ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্র বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা জানানো হয়। বাংলাদেশে ভারতীয় ভিসার আবেদন কেন্দ্র (আইভ্যাক) তাদের ওয়েবসাইটে এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায়। দুপুরে প্রচারিত ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশে ক্রমাবনতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নয়াদিল্লির গভীর উদ্বেগ জানাতে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহকে তলব করে। এ সময় তার মনোযোগ বিশেষভাবে আকর্ষণ করা হয় ‘কিছু চরমপন্থি গোষ্ঠীর’ কর্মকাণ্ডের দিকে, যারা ঢাকায় অবস্থিত ভারতীয় হাইকমিশন ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি সৃষ্টির পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছে। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে ‘চরমপন্থি মহল’ যে ভুয়া বয়ান তৈরির চেষ্টা করছে, ভারত তা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করছে। দুঃখজনকভাবে, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এসব ঘটনার বিষয়ে এখনো পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করেনি কিংবা ভারতের সঙ্গে অর্থবহ কোনো তথ্যপ্রমাণও বিনিময় করেনি। বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়, এর ভিত্তি গড়ে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার সংগ্রামে, যা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক ও জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগমূলক উদ্যোগের মাধ্যমে আরও সুদৃঢ় হয়েছে।

Manual7 Ad Code