ঢাকা ২১শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৭ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ২:৩৭ অপরাহ্ণ, জুন ২০, ২০২৬
ডেস্ক নিউজ : ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের ভেতরে গভীর অসন্তোষ, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি হয়েছে বলে উঠে এসেছে স্থানীয় পর্যবেক্ষণ ও সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়ায়। রেহোভটসহ বিভিন্ন শহরের বাসিন্দারা মনে করছেন, এই চুক্তি ইসরায়েলের জন্য সুবিধার পরিবর্তে নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে এবং দেশটি এখন আরও একা হয়ে পড়েছে।
একই সঙ্গে লেবাননে হিজবুল্লাহর সঙ্গে নতুন করে সংঘর্ষ এবং ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ঘটনাগুলো শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তাই নয়, বরং ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও আসন্ন নির্বাচনের ওপরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
ইসরায়েলের রেহোভট শহরের হার্জল স্ট্রিটের ‘ইন দ্য ট্রি’ ব্রাসারিতে বসে অনেকেই একটি বিষয়ে একমত ছিলেনকয়েক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি ইসরায়েলের জন্য মোটেও ভালো হয়নি। ৫৫ বছর বয়সী আভি পেরেজ বলেন, ‘মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।’
তাদের অনেকেরই ধারণা, ইসরায়েল এখন আগের চেয়ে আরও বেশি হুমকির মুখে এবং এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে দেশটিকে একাই এগোতে হবে। ৩৫ বছর বয়সী শাহাম নোভিক বলেন, ‘কয়েক দিন আগেও আমরা সন্তানদের নিয়ে বোমা হামলার আশঙ্কায় আশ্রয়কেন্দ্রে ছিলাম। আর এখন হঠাৎ সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে গেছে বলা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে কোনো সমস্যারই সমাধান হয়নি।’
তেল আবিব থেকে প্রায় ১২ মাইল দূরের রেহোভটকে দীর্ঘদিন ধরেই জরিপকারীরা ‘মধ্যপন্থী ইসরায়েলের’ প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখে আসছেন। শহরের প্রধান সড়কগুলোতে ইসরায়েলের জাতীয় পতাকার পাশাপাশি প্রাইড পতাকাও উড়তে দেখা যায়। কোথাও উচ্চস্বরে রেভ সংগীত বাজছে, আবার অন্য কোথাও জড়ো হয়েছেন অর্থোডক্স ইহুদিরা। একই সময়ে নতুন বাস ব্যবস্থা নির্মাণকাজ ঘিরে সপ্তাহান্তের যানজটও চোখে পড়ছে।
ব্রাসারিতে আসা অনেকেই কিছু সময়ের জন্য সংবাদ থেকে দূরে থাকতে চাইলেও শুক্রবার ইসরায়েল সবচেয়ে বেশি জায়গা দখল করে নেওয়ার পাশাপাশি নতুন মাত্রায় সংঘর্ষ শুরু করে। এতে হিজবুল্লাহর হামলায় একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাসহ চার ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার পর ইসরায়েলি বাহিনী লেবাননে ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। এতে হিজবুল্লাহর অন্তত ১৮ জন নিহত এবং আরও ৩৩ জন আহত হন।
ইসরায়েলের অনেক নাগরিকের বিশ্বাস করেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইরানের সঙ্গে হওয়া চুক্তি তাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল। দেশটির বিভিন্ন বিশ্লেষক ও ভাষ্যকার এ চুক্তিকে ‘আত্মসমর্পণ’ ও ‘অপমানজনক সমঝোতা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাদের মতে, এটি ইসরায়েলের আশঙ্কার চেয়েও খারাপ।
শুধু ইরান আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসতে পারে এমন আশঙ্কাই নয়, লেবাননকে ঘিরে হওয়া সমঝোতা ইসরায়েলের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। অনেকের আশঙ্কা, এই চুক্তি হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের স্বাধীনতাকে সীমিত করতে পারে। আর ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহকে দেশটির উত্তরাঞ্চলের জন্য অন্যতম বড় হুমকি হিসেবে দেখা হয়।
ইসরায়েলের রাজনৈতিক কৌশলবিদ ও আন্তর্জাতিক প্রচারাভিযান ব্যবস্থাপক উদি টেনে বলেন, ‘ইসরায়েলিদের কাছে লেবাননের যুদ্ধ একটি ন্যায্য যুদ্ধ। এখানে সবাই মনে করে, ইরান ও হিজবুল্লাহ কার্যত একই শক্তির দুটি অংশ।’
লেবানন সীমান্তঘেঁষা উত্তরাঞ্চলীয় শহর মেতুল্লাতেও ক্ষোভ স্পষ্ট। স্থানীয় রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী ড্যানিয়েল ডর্ফম্যান বলেন, ‘ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মানুষ সন্তুষ্ট ছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া চুক্তি ইসরায়েলের জন্য ভালো হয়নি। এটি বড় ধরনের ভুল।’
আবার অনেকের মতে, ইসরায়েল তার ঘোষিত লক্ষ্য ইরানে সরকার পরিবর্তন, দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নির্মূল কোনোটিই অর্জন করতে পারেনি। তারা একে ‘চরম ব্যর্থতা’ হিসেবে দেখছেন।
সমালোচকদের ভাষ্যমতে, যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে’ এগোলেও শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনের কাছে ইসরায়েল অনেকটাই গুরুত্ব হারিয়েছে। গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশটিকে ‘ছোট শক্তি’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রিত হয়ে ট্রাম্পকে পরামর্শ দেওয়ার পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে শুনতে হয়েছে তীব্র সমালোচনা। বিশেষ করে লেবাননে ইসরায়েলের অব্যাহত হামলায় চার হাজারের কাছাকাছি মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় আন্তর্জাতিক চাপ ও সমালোচনা আরও বেড়েছে।
দুর্নীতির অভিযোগে বিচারাধীন ৭৬ বছর বয়সী নেতানিয়াহুর সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ ভোটারদের বোঝানো যে, তিনিই কেবল ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম।
ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের জনমত বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তামার হারম্যান বলেন, ‘নিজের লক্ষ্যগুলো খুব স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে নেতানিয়াহু এক ধরনের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস দেখিয়েছিলেন। কিন্তু সেগুলো পূরণে ব্যর্থ হলে মানুষ মনে করে, তিনি নিজের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে অক্ষম।’
রেহোভট শহরে ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ইসরায়েলি নাগরিকের সংখ্যা খুবই কম। ইহুদি ভোটারদের মনোভাব বোঝার ক্ষেত্রেও শহরটিকে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে ধরা হয়। ইসরায়েলের মোট ভোটারের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই ইহুদি। আগামী অক্টোবরে জাতীয় নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিরোধী শিবিরের এক জ্যেষ্ঠ নেতা গত সপ্তাহে বলেন, ‘আসন্ন নির্বাচন দেশের জন্য বড় ধরনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। এর গুরুত্ব অতিরঞ্জিত করে বলার সুযোগ নেই।’
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত এবং প্রায় ২৫০ জন অপহৃত হওয়ার পর থেকেই নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। হামলার পেছনে থাকা নিরাপত্তা ব্যর্থতা তার সমর্থকদের মধ্যেও আস্থার সংকট তৈরি করে। এরপর গাজায় ইসরায়েলের দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী সামরিক অভিযান দেশটিকে আন্তর্জাতিকভাবে অনেকটা বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এতে ৭৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই বেসামরিক নাগরিক। বর্তমানে গাজার প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ২৩ লাখ মানুষের অধিকাংশের ওপর এখনো হামাসের প্রভাব বজায় রয়েছে। অন্যদিকে, হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লেবাননে চালানো ধারাবাহিক অভিযানও চূড়ান্ত ফল বয়ে আনতে পারেনি। তবে সব সমালোচনার মধ্যেও নেতানিয়াহুর প্রতি অনুগত একটি অংশ এখনো রয়েছে। গত সপ্তাহে অনির্ধারিত ভোটারদের মধ্যে জরিপে দেখা গেছে, ইরানের মোকাবিলায় সবচেয়ে কার্যকর নেতৃত্ব হিসেবে ৪৩ শতাংশ মানুষ নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোটকেই বেছে নিয়েছেন।
রেহোভটের সেই ব্রাসারিতে বসে প্রকৌশলী আভি পেরেজ বলেন, ‘নেতানিয়াহু মানুষ, তাই ভুল করতেই পারেন। কিন্তু তিনি জানেন কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়। তিনি জানেন ইসরায়েলের কী প্রয়োজন। তিনি নিজের দেশের হয়ে কথা বলেন, আর ট্রাম্প কথা বলেন নিজের ব্যবসার স্বার্থে।’
বিশ্লেষকদের মতে, এমন বিভক্ত জনমতের কারণে আসন্ন নির্বাচন অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে যাচ্ছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নেতানিয়াহু শেষ পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বীদের ছাপিয়ে যেতে পারেন বলেও অনেকে মনে করছেন। অধ্যাপক হারম্যানের ভাষায়, ‘আমার মনে হয় তিনি চাপে আছেন, কিন্তু তার হাতে আর কী কৌশল আছে, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। রাজনীতিতে তিনি যেন এক ‘হুডিনি’ যিনি শেষ মুহূর্তে অপ্রত্যাশিত কিছু করে বসতে পারেন।’
রেহোভটের ৩৪ বছর বয়সী চিকিৎসক লি নোভিকের মতে, ইসরায়েলিরা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি বিভক্ত। তিনি বলেন, ‘নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে আমাদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করার চেষ্টা করছেন এবং তাতে তিনি সফলও হয়েছেন। বছরের পর বছর ধরে এটি চলেছে। এদিকে বাড়ির দাম বা মূল্যস্ফীতির মতো মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে কেউ আর মাথা ঘামাচ্ছে না।’
তার ভাষায়, ‘ইরান যখন বলে তারা ইসরায়েলকে ধ্বংস করতে চায়, আমি সেটি বিশ্বাস করি। কেনই বা করব না? কিন্তু এই সরকার যুদ্ধকে ব্যবহার করছে বিভাজনমূলক আইন পাস করাতে এবং ক্ষমতায় টিকে থাকার হাতিয়ার হিসেবে।’
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকর্তারাও মনে করেন, ইহুদি ইসরায়েলিদের মধ্যে বিভক্তি এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। তাদের একজন বলেন, ‘ইসরায়েলিরা যেন একে অপরের সঙ্গে নয়, একে অপরকে পাশ কাটিয়ে কথা বলছে। সাধারণ ঐকমত্যের জায়গাটা আর নেই।’
তবে এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেন জনমত বিশ্লেষক অধ্যাপক তামার হারম্যান। তার মতে, গত কয়েক দশকে আরও তীব্র মেরুকরণের সময় পার করেছে ইসরায়েল, বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকে। তিনি বলেন, বিভেদের চেয়ে ইহুদি ভোটারদের মধ্যে মিলই বেশি। অর্থনৈতিকভাবে উদার নীতির পাশাপাশি প্রগতিশীল করব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত শক্তিশালী কল্যাণ রাষ্ট্রের ধারণা, কঠোর নিরাপত্তানীতি, ইসরায়েলকে একটি ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে টিকিয়ে রাখার প্রশ্ন এবং ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান বাস্তবসম্মত নয় এসব বিষয়ে অধিকাংশ ইহুদি ভোটারের অবস্থান প্রায় একই।
আরও তাৎক্ষণিকভাবে, লেবাননে চলমান সামরিক অভিযানের প্রতি অধিকাংশের সমর্থন রয়েছে। একই সঙ্গে বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা থেকে অর্থোডক্স ইহুদি সম্প্রদায়ের জন্য ছাড় দেওয়ার প্রস্তাবিত আইনগুলোর বিরুদ্ধেও জনমত শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
হারম্যানের ভাষায়, ‘মেরুকরণ নিয়ে এত আলোচনা হয়তো শেষ পর্যন্ত নিজেই নিজের সত্যে পরিণত হচ্ছে।’
রেহোভটের ৫৫ বছর বয়সী ডালিয়া পেরেজ মনে করেন, গত সপ্তাহের ঘটনাগুলো তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি হয়তো কখনোই আসবে না।
তিনি বলেন, ‘আমি যুদ্ধের অবসান চেয়েছিলাম। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, আমাদের সবসময় অস্ত্রের ওপর ভর করেই বেঁচে থাকতে হবে। আমরা বুঝতে পেরেছি, আমাদের প্রকৃত কোনো বন্ধু নেই এবং কাউকেই পুরোপুরি বিশ্বাস করা যায় না।’
Design and developed by sylhetalltimenews.com