দুই ইস্যুতে মুখোমুখি দুই দল

প্রকাশিত: ৫:৫২ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ৭, ২০২৫

দুই ইস্যুতে মুখোমুখি দুই দল

Manual7 Ad Code

এসএটিনিউজ ডেস্ক :: জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য গণভোট আগামী সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে হবে নাকি আগেই হবে- এ নিয়ে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতসহ কয়েকটি দলের মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সোমবার উপদেষ্টা পরিষদ জরুরি বৈঠক করে দলগুলোর কাছ থেকে এক সপ্তাহের মধ্যে ‘ঐক্যবদ্ধ দিকনির্দেশনা’ চেয়েছে। এর মধ্যেই জুলাই সনদ এবং গণভোট ইস্যুতে প্রকাশ্য বিরোধী অবস্থান নিয়েছে বিএনপি ও জামায়াত।

Manual6 Ad Code

বিএনপি জুলাই সনদে তাদের দেওয়া নোট অব ডিসেন্ট, পিআর পদ্ধতি, নির্বাচনের আগে গণভোটের ইস্যুতে সোচ্চার রয়েছে।

দলটি বলছে, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই গণভোট হতে হবে। এ বিষয়ে আমরা একমত। সংসদ নির্বাচনের আগে কোনো গণভোট হতে দেওয়া হবে না।’

Manual6 Ad Code

অপরদিকে, জামায়াত ইসলামী নির্বাচনের আগে গণভোট এবং পিআর পদ্ধতির দাবিতে আন্দোলন করছে।

জামায়াত বলছে, নো হাংকি পাংকি, জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট লাগবেই।

পাশাপাশি বিএনপি-জামায়াত দুই দলই জাতীয় নির্বাচনে বাধা সৃষ্টির বিষয়েও পরস্পরকে দোষারোপ করছে।

এ অবস্থায় অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথমার্ধে অনুষ্ঠান নিয়ে আবারও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। কিন্তু তার আগে জুলাই সনদ এবং গণভোট ইস্যুতে মুখোমুখি অবস্থানে রাজনৈতিক দলগুলো। এর মধ্যে বড় দুই দল বিএনপি জুলাই সনদে নোট অব ডিসেন্ট রাখা এবং জামায়াত জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোটের দাবিতে অনড় অবস্থানে রয়েছে। জাতীয় নির্বাচনে বাধা সৃষ্টির বিষয়েও একে অপরকে দোষারোপ করছে।

বৃহস্পতিবার বিকেলে যশোর টাউন হল মাঠে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলামের ৭ম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠিত স্মরণসভায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই গণভোট হতে হবে। এ বিষয়ে আমরা একমত। সংসদ নির্বাচনের আগে কোনো গণভোট হতে দেওয়া হবে না।

বিএনপির মহাসচিব বলেন, কয়েকটি রাজনৈতিক দল বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করছে। নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করছে। নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এটা জনগণ মেনে নেবে না। অনেক রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীন হয়েছি ফ্যাসিস্টের হাত থেকে। একটা সুযোগ পেয়েছি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার। কোনো মহলের চক্রান্তে আমরা এই সুযোগ বিনষ্ট হতে দিতে পারি না।

রাজনৈতিক দলগুলোকে হুঁশিয়ারি দিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা অনেক দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছি। আমরা এখনো কোনো বিষয়ে রাস্তায় নামিনি। আপনারা মনে রাখবেন, বিএনপি কোনো ভেসে আসা দল নয়। বিএনপি এ দেশের জনগণের গড়া একটি দল।

বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘আমি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানাতে চাই, দয়া করে পানি ঘোলা করবেন না। আপনারা দেশকে অস্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যাবেন না। দয়া করে দেশের মানুষকে অশান্তিতে নেওয়ার ব্যবস্থা করবেন না। আমরা বহু সংগ্রাম করেছি, বহু লড়াই করেছি। ৬০ লাখ মানুষের বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে। ২০ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। আপনারা নতুন করে শুরু করছেন। আপনারা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করছেন। সেটা এ দেশের জনগণ মেনে নেবে না।

Manual4 Ad Code

অবিলম্বে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আহ্বান জানিয়ে বিএনপির মহাসচিব বলেন, আর টালবাহানা না করে অবিলম্বে নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণার ব্যবস্থা করুন এবং অক্টোবরে সংস্কারের যে সিদ্ধান্ত হয়েছে, সেগুলো নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যান। অন্যথায় আপনারা ব্যর্থ সরকারে পরিণত হবেন। এর সব দায়ভার আপনাদের বহন করতে হবে।

ঐকমত্য কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্টতার অভিযোগ তুলে মির্জা ফখরুল বলেন, আপনারা এখন বলছেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে বসে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তাহলে আপনারা এত দিন কী করলেন। আপনারা কাজটা ঠিক করেননি। আমরা সব সময়ই কমিশনে গিয়েছি, মতামত দিয়েছি।

অপরদিকে, সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোট আয়োজনের দাবি আদায়ে প্রয়োজনে ‘আঙুল বাঁকা’ করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের।

বৃহস্পতিবার ঢাকার পল্টন মোড়ে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর উপস্থিতিতে তিনি বলেছেন, আমরা আপনাদের চালাকি বুঝি। আপনাদের চালাকির ভিত্তিতেই দাবি আদায়ের পন্থাও আমরা আবিষ্কার করব। আমরা এখনো নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় আন্দোলনে আছি। সোজা আঙুলে যদি ঘি না উঠে তাহলে আঙুল বাঁকা করবো। কিন্তু ঘি আমাদের লাগবেই। সুতরাং যা বোঝাতে চাই, বুঝে নিন। নো হাঙ্কি-পাঙ্কি, জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট লাগবেই।

সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের বলেন, আমরা আশা করেছিলাম, জুলাই-অগাস্টের রক্তই হবে শেষ রক্তদান। এসময়ের শাহাদাতই হবে শেষ শাহাদাত। আমরা আশা করেছিলাম, জুলাই বিপ্লবের পরে দাবি আদায়ে আর রাজপথে নেমে আসতে হবে না। কিন্তু আমরা আশাহত হয়েছি। অল্প সময়ের ব্যবধানেই আমাদের রাজপথে আসতে হয়েছে। আমরা রাজপথে এসেছি, প্রয়োজনে রক্ত দেব, প্রয়োজনে জীবন দেব; কিন্তু আমরা জুলাই বিপ্লবকে ব্যর্থ হতে দেব না। ষড়যন্ত্রকারীদের পরাজয় হবে। জুলাই সনদকে আইনি ভিত্তি দিতে হুবহু সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হবে ইনশাআল্লাহ।

জামায়াত নেতা তাহের বলেন, সময়ক্ষেপণ, এই চালাকি আপনাদের বিপদে ফেলবে। গণভোট জাতীয় নির্বাচনের আগেই হতে হবে। জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরও গণভোট আয়োজনে কোনো বাধা নাই। সুতরাং সময় আছে। আরও ১৫ দিন সময়ক্ষেপণ করবেন? করেন, গণভোটের সময় থাকবে। সুতরাং যা বোঝাতে চাই, বুঝে নিন।

সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আলাদা দিনে হলে বিপুল অর্থের অপচয় হবে বলে মত দিয়েছেন কেউ কেউ।

এর বিরোধিতা করে সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের বলেন, শুধুই বলেন, গণভোট আয়োজনে নাকি অনেক টাকা খরচা হবে। একদিনে যে পরিমাণ চাঁদাবাজি হয় তা দিয়ে একটা গণভোট আয়োজন করা যায়। প্রত্যেকদিন একটা করে গণভোট আয়োজন করলেও সমস্যা হবে না। তাই সরকারকে বলব, আর যারা চাঁদাবাজিতে জড়িত, তাদের বলব—এসব বন্ধ করেন, তাহলে গণভোট আয়োজনে টাকার অভাব হবে না।

জামায়াতে ইসলামীর এ নায়েবে আমির বলেন, আমরা শান্তি চাই, সমাধান চাই, আমরা জাতীয় নির্বাচন চাই। আমরা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন চাই। যদি বুঝতে কষ্ট হয়, তাহলে আসেন, বসি, আলোচনা করি। সরকারও তো আলোচনা করতে বলেছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্দেশে তাহের বলেন, আলোচনার চাপটা তো সরকারকেই নিতে হবে। আলোচনার জন্য একটা রেফারির ভূমিকার দরকার আছে। সেই ভূমিকাটা সরকারকে নিতে হবে।

জামায়াতে ইসলামী ইতোমধ্যে আলোচনার জন্য দুই সদস্যের কমিটি গঠন করেছে। আপনারাও কমিটি ঘোষণা করুন। সময়ক্ষেপণের পলিসি বাদ দিয়ে আলোচনার পলিসি ঠিক করুন।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাননি দাবি করে জামায়াত নেতা তাহের বলেন, চেষ্টা করেছি, ফোনে পাই নাই। আজকের কর্মসূচির পর আমি আবারও চেষ্টা করব। উনাকে আমরা ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ করব, বিএনপিও যেন আলোচনার পরিবেশ তৈরি করেন। আর সময়ক্ষেপণ নয়, আর হিংসা নয়, রাজনৈতিক বিদ্বেষ নয়, অন্যের বিরুদ্ধে লড়াই নয়। জাতি মনে করে, শুধু জুলাই সনদ নয়, সব ঠিক করা সম্ভব রাজনৈতিক সমঝোতায়।

Manual7 Ad Code

হুঁশিয়ার উচ্চারণ করে তিনি বলেন, আজকে স্মারকলিপি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে দেবার পরও যদি দাবি মানা না হয়, অবস্থার উন্নতি না হয়; তাহলে আগামী ১১ তারিখ ‘চলো চলো ঢাকা চলো’ কর্মসূচি। আগামী ১১ তারিখ ঢাকা মহানগরী হবে জনতার নগরী, দাবি আদায়ের ১১ তারিখ। লড়াই হবে। লড়াই লড়াই চাই, লড়াই করে বাঁচতে চাই।

প্রধান উপদেষ্টার উদ্দেশে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, নভেম্বরের মধ্যেই গণভোট আয়োজন করে জুলাই সনদের আইনগত ভিত্তি দিন৷ যদি আপনি সেটা না করেন, তাহলে জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য আপনি যে সম্মান পেয়েছেন, সেটা করতে না পারলে আপনার মর্যাদাকে আপনিই নষ্ট করবেন৷ আপনি (মুহাম্মদ ইউনূস) সম্মান রক্ষার জন্য রাজনৈতিক দলকে এক টেবিলে বসার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। এখানে আপনাকে রেফারির দায়িত্ব পালন করতে হবে। আমরা বৃহত্তর ঐক্যের মধ্য দিয়ে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন সুষ্ঠু করব।

এর আগে, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে নিজ নির্বাচনী এলাকায় গত শুক্রবার (৩১ অক্টোবর) জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের এক সমাবেশ শেষে সাংবাদিকদের বলেন, বিএনপির সংস্কার প্রস্তাব না মানা নতুন করে রাজনৈতিক সংকট তৈরির অপপ্রয়াস। বিএনপি যদি সংস্কার প্রস্তাব না মানে তবে এটা তাদের দায়িত্বহীনতার পরিচয় এবং নতুন করে রাজনৈতিক সংকট তৈরির অপপ্রয়াস। ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় নির্বাচন নিয়ে জনগণের মাঝে সংশয় সৃষ্টি করাই এর উদ্দেশ্য। বিএনপি সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

গণভোট প্রসঙ্গে ডা. তাহের বলেন, ‘আমরা যখন সংস্কারে গণভোটের কথা উল্লেখ করেছি তারা তখন মেনে নিয়েছিল। আমরা চেয়েছি, সংস্কারের বিষয়টি গণভোটে নির্ধারণ করা হোক। তাই আমরা চাই, জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট হতে হবে। তবে বিএনপি বলছে গণভোট ও নির্বাচন একইদিনে হতে হবে। তারা এখন তালের রস আমের রস একসঙ্গে করে ফেলেছে।’

তাহেরের এসব বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শনিবার (১ নভেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবে এক আলোচনা সভায় বলেন, ‘নির্বাচনের পথে এখন পর্যন্ত যত বাধা এসেছে সব আপনারা দিয়েছেন। জনগণকে বোকা বানাবেন না।’

স্বাধীনতাবিরোধীরা মুক্তিযুদ্ধকে নিচে নামিয়ে চব্বিশের আন্দোলনকে বড় করে দেখাতে চায় বলেও উল্লেখ করেন মির্জা ফখরুল।

বিএনপি নির্বাচন পেছাতে চাচ্ছে বলে যে অভিযোগ জামায়াত নেতারা তুলেছেন তার জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন চেয়েছিলাম। নির্বাচন হলে অপশক্তিগুলো মাথা তুলতে পারতো না।