অদূরদর্শী নেতাদের বিজয় : দক্ষিণ এশিয়ার অভিজ্ঞতা

প্রকাশিত: ৮:৩৯ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ১৬, ২০২৫

অদূরদর্শী নেতাদের বিজয় : দক্ষিণ এশিয়ার অভিজ্ঞতা

Manual4 Ad Code

ক্ষমতা ও প্রজ্ঞার বৈপরীত্য

সিলেট অলটাইম নিউজ :মানব ইতিহাসের দীর্ঘ ধারায় এরিস্টটলের এথেন্স থেকে আজকের দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত একটি প্রশ্ন অবিরত তাড়িয়ে বেড়ায়—‘কেন সমাজ প্রায়ই ক্ষমতার আসনে বসায় তাদেরই, যারা প্রজ্ঞাবান নয়, নৈতিকভাবে শ্রেষ্ঠ নয়, কিংবা দূরদর্শী নয়?’

গোষ্ঠীভিত্তিক রাজনীতি, কিংবা শ্রীলঙ্কার লেনদেনভিত্তিক শাসনব্যবস্থায় একই ধারা দেখা যায়—আনুগত্য, ক্যারিশমা ও জনতাবাদের পুরস্কার মেলে; প্রজ্ঞা ও নৈতিকতার অধিকারীরা হারিয়ে যায়।

Manual5 Ad Code

অতএব এই অঞ্চলের রাজনৈতিক বিকলতা কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটি এক সুসংগঠিত ব্যবস্থার পূর্বনির্ধারিত ফল, যে ব্যবস্থা রাষ্ট্রনায়ক নয়, টিকে থাকার শিল্পে দক্ষদেরই বেছে নেয়।

ক্ষমতা নৈতিক নয়, কৌশলীকে পুরস্কৃত করে

এরিস্টটলের ভাষায়, আদর্শ শাসক শাসন করেন জনগণের মঙ্গলার্থে, অথচ অপ্রাজ্ঞ নেতা শাসন করেন নিজের স্বার্থে বা গোষ্ঠীর সুবিধার জন্য। আধুনিক দক্ষিণ এশিয়ার নেতৃত্ব এই গোষ্ঠী-নিয়ন্ত্রণের কলা আয়ত্ত করেছে।

বাংলাদেশের শেখ হাসিনার শাসন দেখায়, কীভাবে আনুগত্য ও নিয়ন্ত্রণ দূরদর্শিতাকে অতিক্রম করে। তার সরকারের গোয়েন্দা নজরদারি, বিচারব্যবস্থার ওপর প্রভাব এবং মতভিন্নতার প্রতি অসহিষ্ণুতা এমন এক আমলাতান্ত্রিক প্রজন্ম সৃষ্টি করেছে, যারা উদ্ভাবনের চেয়ে আনুগত্যে বেশি পারদর্শী।

ভারতে নরেন্দ্র মোদির শাসনও দেখায়, কীভাবে জনতাবাদ বহুত্ববাদকে গ্রাস করে। তার নির্বাচনি শক্তি নীতিগত আলোচনা নয়, বরং জাতীয়তাবাদী পরিচয় ও ধর্মীয় আবেগের সূক্ষ্ম বিন্যাসের ওপর দাঁড়িয়ে। তিনি ধর্মীয় আবেগ ও জাতীয় গর্বকে কাজে লাগিয়ে কর্তৃত্ব বজায় রাখেন এরিস্টটলের ‘জনতাবাদী নেতা’রই আধুনিক প্রতিরূপ, যিনি ‘জনগণের তোষামোদ করে গণতন্ত্রকে স্বৈরতন্ত্রে পরিণত করেন’।

Manual6 Ad Code

পাকিস্তানে ইমরান খান একসময় সংস্কারক হিসেবে আবির্ভূত হলেও তার রাজনীতি দ্রুত ব্যক্তিপূজা ও সংঘর্ষে রূপ নেয়; প্রাতিষ্ঠানিক নির্মাণ সেখানে অধরা। শ্রীলঙ্কায় রনিল বিক্রমাসিংহে, বুদ্ধিবৃত্তিক হলেও, গণঅংশগ্রহণের পরিবর্তে এলিট ঐকমত্যের ভিত্তিতে শাসন করেন এবং ধ্বংসস্তূপের মধ্যে টিকে থাকার কৌশলকেই অগ্রাধিকার দেন। নেপালের সাবেক বিপ্লবী পুষ্পকমল দাহাল ‘প্রচণ্ড’ আজ জোটনির্ভর সমঝোতার রাজনীতিতে সেই নৈতিক আদর্শ হারিয়েছেন, যা একসময় তাকে অনুপ্রাণিত করেছিল।

Manual7 Ad Code

প্রত্যেক উদাহরণই এরিস্টটলের একই শিক্ষা প্রতিফলিত করে—যখন রাজনৈতিক সাফল্য নৈতিকতার চেয়ে কৌশলের ওপর নির্ভর করে, নেতৃত্ব তখন নাট্যরূপ ধারণ করে রূপান্তর নয়, অভিনয়।ন্যায়ের চেয়ে স্থিতিশীলতার আকাঙ্ক্ষা

এরিস্টটল লক্ষ করেছিলেন, সমাজ প্রায়ই ন্যায়ের চেয়ে স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়। দক্ষিণ এশিয়ার মানুষ দীর্ঘকাল ধরে সংঘাত, দুর্নীতি ও বিশৃঙ্খলায় ক্লান্ত, প্রায়ই শৃঙ্খলার বিনিময়ে স্বৈরতন্ত্র মেনে নেয়।

বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সমর্থকরা মনে করেন, তার ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ বিশৃঙ্খলা ঠেকানোর প্রয়োজনীয় উপায়, যদিও তা গণতন্ত্রকে সংকুচিত করে। মোদির কর্তৃত্বও একইভাবে জাতীয় ঐক্য রক্ষার অপরিহার্য মাধ্যম হিসেবে উপস্থাপিত হয়। উভয় ক্ষেত্রেই জনগণ স্থিতিশীলতার নামে তাদের নৈতিক স্বাধীনতাই ত্যাগ করে।

এরিস্টটলের মতে, এই ‘শৃঙ্খলার আকাঙ্ক্ষা’ গভীরতর নৈতিক ক্লান্তির লক্ষণ। যখন নাগরিকরা নৈতিকতাকে আর জনকল্যাণ হিসেবে বিশ্বাস করে না, তখন তারা পিতৃতান্ত্রিক কর্তৃত্বের কাছে আত্মসমর্পণ করে; ফল হয় শান্তি নয়, নিয়ন্ত্রিত স্থবিরতা।

প্রাতিষ্ঠানিক স্থবিরতা ও আনুগত্যের চক্র

দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের শাসকদের নৈতিক চরিত্রই প্রতিফলিত করে। আমলাতন্ত্র, রাজনৈতিক দল ও বিচারব্যবস্থা প্রশ্ন তুলতে নয়, মানিয়ে নিতে শেখে। এরিস্টটলের ভাষায়, এর দীর্ঘমেয়াদি ফল ‘ব্যবস্থাগত নৈতিক অবক্ষয়’।

বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র নাগরিকদের নয়, শাসকদলের স্বার্থরক্ষায় নিবেদিত। ভারতে প্রশাসন ক্রমেই আদর্শগত মেরূকরণের শিকার। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠানগুলো বারবার সামরিক প্রভাব ও জনতাবাদী দখলের মধ্যে দোদুল্যমান। শ্রীলঙ্কার প্রশাসনিক কাঠামো দশকের পর দশক পৃষ্ঠপোষকতার ফলে শূন্য হয়ে পড়েছে।

এই স্থবিরতা নিশ্চিত করে যে সংস্কারকরা কখনো ওপরে উঠতে পারেন না; যারা প্রশ্ন তোলে তারা সরিয়ে দেওয়া হয়, যারা মানিয়ে নেয় তারা পুরস্কৃত হয়। অদূরদর্শী নেতৃত্ব তাই কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটি সচেতনভাবে তৈরি এক প্রক্রিয়া।

নাগরিক বিচ্ছিন্নতা ও নৈতিকতার অবক্ষয়

Manual6 Ad Code

এরিস্টটলের শেষ সতর্কবার্তা ছিল, নাগরিক নৈতিকতা হারালে গণতন্ত্র ভেঙে পড়ে। যখন নাগরিকরা নিরাশ, অজ্ঞ বা ভীত হয়ে পড়ে, তখন তারা আর প্রজ্ঞাবান নেতৃত্বের দাবি তোলে না। দক্ষিণ এশিয়ার শিক্ষিত সমাজ রাজনীতিকে প্রায়ই নোংরা ও অনার্জনীয় মনে করে, ফলে শাসন চলে যায় সুযোগসন্ধানীদের হাতে।

বাংলাদেশে নাগরিক আন্দোলন দমন করা হয়েছে আইনগত ভয় দেখিয়ে; ভারতে স্বাধীন সংবাদমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ রাষ্ট্র ও করপোরেট চাপে আক্রান্ত; পাকিস্তানে মধ্যবিত্ত শ্রেণি বিপ্লবী উচ্ছ্বাস ও পরিত্যাগের মধ্যে দোলাচলে; শ্রীলঙ্কা ও নেপালে অর্থনৈতিক হতাশা জন্ম দিয়েছে নৈতিক উদাসীনতার।

এরিস্টটলের মতে, নাগরিক নৈতিকতা ছাড়া গণতন্ত্র অবশ্যম্ভাবীভাবে আবেগনির্ভর জনতাবাদে পরিণত হয়। নাগরিকরা যখন সরে যায়, তখন মধ্যমতা শূন্যতা পূরণ করে।