‘ব্যাটম্যান’ এমবাপ্পে হলে ‘রবিন’ ওলিসে

প্রকাশিত: ১:৫৯ অপরাহ্ণ, জুলাই ১, ২০২৬

‘ব্যাটম্যান’ এমবাপ্পে হলে ‘রবিন’ ওলিসে

Manual1 Ad Code

ফেরেঙ্ক পুসকাস-জোসেফ বজসিক, রেমন্ড কোপা-জুস্ত ফন্তেইন, ইয়োহান ক্রুইফ-ইয়োহান নেসকেন্স। একটু দম নিয়ে আবার শুরু করা যায়। রোমারিও-বেবেতো, রোনালদো-রিভালদো…কিলিয়ান এমবাপ্পে-মাইকেল ওলিসে। শেষ দুজন খেল দেখাচ্ছেন এবারের বিশ্বকাপে।

Manual1 Ad Code

এমবাপ্পে তাতে শিরোনাম, ওলিসে যেন ভেতরের খবর। ডিসি কমিকসের সুপারহিরো জুটি ব্যাটম্যান-রবিন ‘ডায়নামিক ডুয়ো’কেও মনে পড়তে পারে। রবিন যেমন ব্যাটম্যানের ‘সাইডকিক’—এমবাপ্পের জন্য ওলিসেও ঠিক তাই। সহজ কথায়, ময়ূর যেমন বর্ষাকালে বেশি পেখম ছড়ায়—এমবাপ্পেরও তেমনি পেখম ছড়ানোর মতো ভয়াল সুন্দর আক্রমণের পেছনে ওলিসে সেই ‘বর্ষাকাল’।

ফ্রান্সের মাঝমাঠ থেকে অ্যাটাকিং থার্ডে এমবাপ্পে-ওলিসের যেমন বিচরণ, সেটা দেখেই ব্যাটম্যান-রবিনের অভিযানকে কারও কারও মনে পড়তে পারে। কী নেই তাতে! গতি, রোমাঞ্চ, দুই পায়ের অ্যাকশন, দুটি নদীর জল মিশে একই রকম হয়ে যাওয়ার মতো বোঝাপড়া এবং গোল। আরেকটু বাড়িয়ে বলা যায়। ব্যাটম্যানের জন্য রবিন যতটা নিঃস্বার্থ, ওলিসে এমবাপ্পের জন্যও ঠিক তাই।

Manual8 Ad Code

কিন্তু শুধু মুখের কথায় চিড়ে ভেজে না। তাই সাম্প্রতিকতম উদাহরণই দেওয়া যাক। গতকাল রাতে ফ্রান্স-সুইডেন ম্যাচে এমবাপ্পের জোড়া গোলে একটিতে অবদান ওলিসের। তাঁর অন্য ‘অ্যাসিস্ট’ বারকোলার গোলে। গোল এবং অ্যাসিস্ট বাদ দিন। বোঝাপড়াটা নজর কাড়ে সবচেয়ে বেশি। সুইডেন ম্যাচেই যেমন অ্যাটাকিং থার্ডে এমবাপ্পে-ওলিসের বোঝাপড়াটা যেন রীতিমতো ‘টেলিপ্যাথিক’—পাস কোথায় দিতে হবে, কে কোথায় দাঁড়িয়ে, বল কতটা বাঁকালে সে পর্যন্ত পৌঁছাবে, সেটা যেন দুজনের মাথায়ই প্রোগ্রাম করা!

এমবাপ্পের কোলে ওলিসে। মাঠের খেলায়ও তাদের বোঝাপড়া এমনইএএফপি

বিশেষ করে ফ্রান্স আক্রমণে ওঠার সময় ব্যাপারটা বোঝা যায় আরও ভালো। গ্রামের লবণ খেলার মতো প্রতিপক্ষ যেন হাজার চেষ্টাতেও দুজনের কাউকেই ছুঁতে (থামাতে) পর্যন্ত পারে না! এবার বিশ্বকাপে এমবাপ্পের গোল এ পর্যন্ত ৬টি। এর মধ্যে ৩টি গোলের উৎস ওলিসে। আর যদি গোলের সুযোগ তৈরি করার মতো পাস হিসাব করা হয় তাহলে আসলে এমবাপ্পে-ওলিসে জুটির তুলনা চলে না।

নরওয়ের বিপক্ষে উসমান দেম্বলের একক প্রদর্শনীতে হ্যাটট্রিকটুকু বাদ দিলে ফরাসি আক্রমণভাগের ‘ট্রেলার’ তো সবাই দেখছেন—ওলিসের ডিফেন্সচেরা পাস এবং এমবাপ্পের মুভ—যেন দুষ্টের দমনে কমিক বইয়ের রবিন একের পর এক আক্রমণের সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছেন ব্যাটম্যানকে। কিংবা ফুটবলের ভাষায় গোল করাতে পাতে তুলে দেওয়া পাস নামের রসগোল্লা।

এমবাপ্পে সেসব ‘রসগোল্লা’র কতটা সদ্ব্যবহার করছেন তা সবারই জানা। ২৭ বছর বয়সেই বিশ্বকাপে সর্বকালে সেরা সব স্ট্রাইকারদের ছোট্ট তালিকায় তাঁর নামটা ওপরের দিকে। ২৪ বছর বয়সী ওলিসের জন্য ব্যাপারটা তেমন নয়। এটাই তাঁর প্রথম বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপে ফরাসি চিত্রনাট্যে তাই স্বাভাবিকভাবেই তিনি রবিনের চরিত্রে। মানিয়েছেও দারুণ। নইলে কী আর দেশ ও ক্লাবের হয়ে এ মৌসুমেই ৩২টি ‘অ্যাসিস্ট’ হয়!

Manual5 Ad Code

ফ্রান্সের মাঝমাঠে ওলিসের তুলনাই চলে নাএএফপি

সেগুলোর দু-একটি আবার ল্যূভরে বাঁধিয়ে রাখার মতো। সুইডেনের বিপক্ষেই যেমন বারকোলাকে দিয়ে করানো প্রথম গোলে ডিফেন্ডারকে ‘নাটমেগ’ করে দেওয়া পাসটি, এরপর এমবাপ্পেকে দিয়ে গোল করানোর আগে এক ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে বক্সের মধ্যে কাঁটা-কম্পাস দিয়ে মাপা পাস—আশ্চর্য স্বাদের সব ‘রসগোল্লা’! তবে এখন পর্যন্ত সেরাটা সম্ভবত সেনেগালের বিপক্ষে ডান প্রান্তে বাঁকানো সেই পাস থেকে এমবাপ্পের গোলটি। ওই একটি বোঝাপড়াতে নিশ্চিত হয়েছে, বিশ্বকাপে আক্রমণের সেরা সব জুটির তালিকায় এবার এমবাপ্পে-ওলিসেও থাকবেন।

এমবাপ্পের ব্যাপারটা প্রত্যাশিত ছিল। বিশ্বকাপে তিনি আর রক্তমাংসের মানুষ থাকেন না! তাই চমকটা আসলে ওলিসে। ফক্স স্পোর্টসে ফ্রান্সেরই কিংবদন্তি থিঁয়েরি অঁরির কথা শুনলে তাই মনে হয়, এমবাপ্পের চেয়ে তিনি ওলিসেই মজেছেন বেশি, ‘মাঠের পরিস্থিতি যেভাবে দেখে ও বোঝে, সাধারণ কোনো খেলোয়াড়দের পক্ষে তা অসম্ভব। (সুইডেন) ম্যাচের শুরুতে বলেছি, কিলিয়ানই সব সময় সবচেয়ে মূল্যবান খেলোয়াড় (এমভিপি) হবে। কারণ ও এমন সব পরিসংখ্যান দেবে যা অন্য কারও পক্ষে অসম্ভব। কিন্তু মাইকেল ওলিসে আমাদের দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়।’

কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা বলছে পরিসংখ্যান। ফ্রান্সের প্রথম চার ম্যাচে ৫ গোল করিয়েছেন ওলিসে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে তাঁর আগে এমন কিছু করতে পেরেছেন মাত্র দুজন—হাঙ্গেরির লাজলো বুদাই (১৯৫৪, ৬ অ্যাসিস্ট) ও ইতালির আমাদিও বিয়াভাতি (১৯৩৮, ৫ অ্যাসিস্ট)।

গোলের পর গোল করে যাচ্ছেন এমবাপ্পেএএফপি

শুধু তাই নয়, বিশ্বকাপে এক দলে কেউ ন্যূনতম ৬ গোল করেছেন এবং অন্য কেউ ন্যূনতম ৫ গোল করিয়েছেন—এমন কিছু সর্বশেষ দেখা গেছে ১৯৭৪ আসরে। পোল্যান্ড কিংবদন্তি লাতো (৭ গোল) এবং গাদোচা (৫ অ্যাসিস্ট)।

একই তালিকায় আরও কিছু নাম না বলাটা অন্যায়। ১৯৭০ বিশ্বকাপে জেয়ারজিনহো এবং পেলে, ১৯৫৮ বিশ্বকাপে ফন্তেইন-কোপা, সেই বিশ্বকাপেই পেলে ও দিদি, ১৯৫৪ বিশ্বকাপে ককসিস-বুদাই এবং সে আসরেই মোরলক-ফ্রিৎজ।

Manual2 Ad Code

ওলিসের সব পাসেই গোলদাতা এমবাপ্পে নন। তবে এবার বিশ্বকাপে দুজনেই যৌথভাবে নিজ নিজ কাজে সেরা। এমবাপ্পের চেয়ে যেমন বেশি গোল নেই আর কারও। ওলিসের চেয়ে কেউ বেশি গোলও এখন পর্যন্ত বানাতে পারেননি।

মাঠে তাদের রসায়ন দেখলে বিশ্বকাপের পেছন ফেলে আসা পথে এসব কিংবদন্তি জুটিদের মনে পড়ে। খেলা দেখতে দেখতে দুজনের রসায়ন ও বোঝাপড়ায় মনে হয়, শত শত নুড়ির বাধা টপকে কোত্থেকে যেন গলগল করে বেরিয়ে আসছে খাঁটি তরল সোনার স্রোত!