সিলেট জেলার শ্রেষ্ঠ ৫ অদম্য নারীর সাফল্য অর্জনের গল্প

প্রকাশিত: ৫:৪৬ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৭, ২০২৫

সিলেট জেলার শ্রেষ্ঠ ৫ অদম্য নারীর সাফল্য অর্জনের গল্প

Manual5 Ad Code

সিলেট জেলার ৫ ক্যাটাগরীতে সাফল্য অর্জনকারী শ্রেষ্ঠ ৫ জন অদম্য নারীকে সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন ও মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর সিলেটের যৌথ উদ্যোগে আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ ও বেগম রোকেয়া দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় তৃণমূলের সংগ্রামী নারীদের উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত করার লক্ষ্যে প্রতিবছর জীবনযুদ্ধে জয়ী নারীদের স্বীকৃতি প্রদানের জন্য ‘অদম্য নারী’ শীর্ষক কার্যক্রমের আওতায় সিলেটে জেলা পর্যায়ে নির্বাচিত ৫ জন শ্রেষ্ঠ ‘অদম্য নারী-২০২৫ এর সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠান গত ৯ ডিসেম্বর মঙ্গলবার সকালে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়।

Manual5 Ad Code

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার খান মোঃ রেজা-উন-নবী, সভাপতি সিলেটের জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক সুবর্ণা সরকার ও মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর সিলেটের উপপরিচালক শাহিনা আক্তার জেলা পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ ৫ অদম্য নারী অর্থনৈতিক ভাবে সাফল্য অর্জনকারী বিয়ানীবাজারের কলসুমা বেগম, শিক্ষা ও চাকুরী ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী গোলাপগঞ্জের চিরশ্রী পৈত্য, সফল জননী সিলেট নগরীর কেওয়াপাড়ার মোছাঃ গুলরাজ বেগম, নির্যাতনের দুঃস্বপ্ন মুছে জীবন সংগ্রামে জয়ী বিয়ানীবাজারের পারভীন আক্তার, সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন যে নারী সিলেট নগরীর হাউজিং এস্টেটের রিফাত আরা রিফা-কে সম্মাননা প্রদান করেন।
অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী ক্যাগরীতে শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী কলসুমা বেগম (সুমি) বিয়নীবাজার উপজেলার রামদা বাজার গ্রামের মোঃ আব্দুল রহিম ও জয়নব বেগমের সন্তান। তার বাবা ২য় বিয়ে করায় সৎ মায়ের কুটচালে এক সময় তার মাকে তালাক দেন। তারপর শুরু হয় তার উপর নির্যাতন, উপস রাখা, স্কুলে যেতে না দেয়া, বাড়ির সব কাজ তাকে দিয়ে করানো। অনেক কষ্টে এস.এস.সি পাস করার পর এইচএসসিতে ভর্তি হলেও সৎ মায়ের কারণে লেখাপড়া করতে পারেননি। ২০১০ সালে বিয়ানীবাজারের নিদনপুর নিবাসী তারই ফুফাতো ভাই মোঃ জামাল হোসেনের সাথে তার বিবাহ হয়। বিয়ের পর শুরু হয় আরেক যুদ্ধ, বিশেষ করে তার স্বামীকে কর্মক্ষত্রে মনযোগী করা ও বদ অভ্যাসগুলো ত্যাগ করিয়ে বহু কষ্টে তাকে সিএনজি অটো চালনায় মনযোগী করেন।
স্বামীকে সহযোগিতা করার পাশাপাশি ২০১৭ সালে সন্তানদের ভরণ-পোষণের চাহিদা বৃদ্ধি ও পারিবারিক আর্থিক চাপে নতুন আয়ের পথ খুঁজতে শুরু করেন কলসুমা বেগম সুমি। নিজের মনের লোকানো স্বপ্নকে জাগ্রত করে প্রবল ইচ্ছা শক্তিকে কাজে লাগিয়ে প্রতিবেশীর কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা ধার নিয়ে ঘরে বসে অনলাইনে কাপড়ের ব্যবস্যা শুরু করেন। বিভিন্ন ধরনের ফ্যাশন আইটেম বিক্রি করে মানুষের বিশ্বাস ও সমর্থন পেয়ে ব্যবসায় বেশ ভালো সাড়া পান এবং ধীরে ধীরে ব্যবসায় উন্নতি হতে থাকে। পরবর্তীতে তিনি ‘সিলেট অনলাইন শপিং’ নামে প্রথম শোরুম প্রতিষ্ঠা করেন বিয়ানীবাজারে।
ব্যবসা ক্ষেত্রে বিয়ানীবাজারের মত একটি জায়গায় একজন নারীর পথচলা খুব সহজ ছিল না। সংসারে আর্থিক সমস্যা, সন্তানের ভরণপোষণ, সমাজের বাঁকা কথা সব মিলিয়ে কঠিন সময় পার করতে হয়েছে তাকে। মানুষ বলতো “মেয়ে হয়ে ব্যবসা করবে? হবে না!” ব্যবসা করাটা শুরুতে শ্বশুর বাড়ীর কেউ মেনে নিতে চায়নি। শাশুড়ি, দেবর, ননদ, জ্বা সবাই কথা শুনাতো। কিন্তু তিনি ভেঙ্গে পড়েননি, তার বিশ্বাস ছিল তিনি পারবেন। সন্তানদের ঘুম পাড়িয়ে রাত জেগে লাইভ করতেন, একা একা অর্ডার প্যাক করতেন। আজ যেটুকু সফল হয়েছেন সেটা কারো দান নয়, এটা তার পরিশ্রম, গ্রাহকদের ভালবাসা, তার মায়ের দোয়া ও আল্লাহর রহমত।
তিনি বিয়ানীবাজারে ‘অনলাইন শপ বায় সুমি’ নামে দ্বিতীয় শোরুম চালু করেছেন। বর্তমানে তার অধীনে ১০ জন কর্মী কাজ করছেন। তিনি সিলেট উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির একজন প্রিমিয়াম সদস্য। খুব শীঘ্রই তার নিজস্ব ওয়েবসাইট ‘অনলাইন শপ বায় সুমি’ লঞ্চ হতে যাচ্ছে যার মাধ্যমে আরও বৃহৎ পরিসরে ব্যবসা সম্প্রসারিত হবে। তার স্বামীকে একটি গাড়ি কিনে দিয়েছেন। বর্তমানে তার স্বামী সিএনজি অটোরিক্স্া বাদ দিয়ে এক্স ফিল্ডার গাড়ি চালিয়ে উপার্জন করছেন। পাশাপাশি তার পেইজ থেকেও প্রতিদিন ডলার আসছে। তার পেইজের ফলোয়ারস প্রায় পৌনে দুই লক্ষ।
কলসুমা বেগম চান দেশের প্রতিটি নারী নিজে উপার্জন করে পরিবারে ও সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক, কারো বোঝা না হোক। ভবিষ্যতেও আরও নারীর পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সফলতার পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে চান তিনি। তার ব্যবসার ভবিষ্যৎ লক্ষ্য হলো সিলেটের অনলাইন শপিং–কে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়া এবং নারী উদ্যোক্তাদের নিজস্ব আয়ের পথ সুগম করাসহ সিলেটের নারী উদ্যোক্তাদের একটি বড় প্ল্যাটফর্ম নারী উদ্যোক্তা ফাউন্ডেশন তৈরী করা।
১৬ বছর সংসার জীবনে তিনি দুই ছেলে ও এক মেয়ের মা। সংসারের সাথে তাল মিলিয়ে সবসময় কিছু করার স্বপ্ন দেখেছেন, স্বপ্ন দেখেছেন নিজের পায়ে দাঁড়ানোর। আজ তিনি সফল একজন উদ্যোক্তা। কলসুমা বেগম কঠোর পরিশ্রম করে অর্থনৈতিক ভাবে সফল হয়ে সমাজে উদাহরণ সৃষ্টি করায় তাকে অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছেন।
শিক্ষা ও চাকুরী ক্ষেত্রে কৃতিত্ব অর্জনকারী নারী ক্যাটাগরীতে শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী চিরশ্রী পৈত্য গোলাপগঞ্জ উপজেলার ঢাকাদক্ষিণের রায়গড় নিবাসী সজল কান্তি দাস এর স্ত্রী। চিরশ্রী পৈত্য, সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলার ভাতগাঁও ইউনিয়নের জিগলী নামক প্রত্যন্ত পল্লীতে নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। কৃষক সতীশ চন্দ্র পৈত্য ও নীলিমা পৈত্য এর চার সন্তানের চিরশ্রী বড়। তিনি যে জায়গায় জন্ম গ্রহন করেন সেখানে তৎকালীন সময়ে পড়ালেখা করার ভাল কোন ব্যবস্থা ছিলনা। অল্প শিক্ষিত মা-বাবা, নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে সন্তানের পড়াশুনায় যতটুকু মনযোগ দেওয়া দরকার বা প্রয়োজনীয় অর্থ ব্যয় করা দরকার তা করতে পারেননি।
চিরশ্রী পৈত্য নবম শ্রেণিতে উঠার পর বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী হিসেবে আলাদা প্রাইভেট শিক্ষকের কাছে পড়ার মতো কোন সুযোগ ছিল না। নিজের মেধা এবং চেষ্টাকে কাজে লাগিয়ে ১৯৯১ সালে এসএসসি পরীক্ষায় ১ম স্থান অর্জন করেন। পারিপার্শিক কারণে ছাতক ডিগ্রি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হয়ে ১৯৯৩ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ২য় বিভাগ পেয়ে এইচ.এস.সি পাস করেন। যেহেতু ছাতক ডিগ্রী কলেজে স্নাতক পর্যায়ে বিজ্ঞান বিভাগ ছিল না তাই তিনি বাধ্য হয়ে মানবিক বিভাগে বি.এ ক্লাসে ভর্তি হন এবং ১৯৯৫ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ২য় বিভাগে বি.এ পাস করেন।
ইতোমধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞাপন দেখে আবেদন করেন এবং চাকুরির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্ত হন মোহাম্মদপুর নামক নিভৃত পল্লীতে যেখানে মাটির ঘরে কোপি বাতি জালিয়ে একটি জেলে পরিবারের সাথে দীর্ঘদিন বসবাস করতে হয়েছে। অনেক প্রতিকুলতার সাথে যুদ্ধ করে চাকুরি করেছেন তিনি। চাকুরির পাশাপাশি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সিলেট এমসি কলেজ থেকে রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিষয়ে ১৯৯৮ সালে ২য় বিভাগে এমএএস পাস করেন।
১৯৯৯-২০০০ সনে সিলেট পি টি আই-তে সি ইন এন এড কোর্সে ভর্তি হয়ে ১ম বিভাগে উত্তীর্ন হন। চিরশ্রী পৈত্য ইংরেজী বিষয়ের একজন মাস্টার ট্রেইনার। তিনি ছাতক উপজেলা রিসোর্স সেন্টারের অধীনে মাস্টার ট্রেইনার হিসেবে অনেকগুলো ব্যাচ ট্রেনিং করিয়েছেন।
২০০৫ সালে বিবাহজনিত কারণে স্বামীর স্থায়ী ঠিকানা গোলাপগঞ্জ উপজেলায় বদলী হয়ে আসেন। এখানে এসেও বিভিন্ন প্রতিকুলতার মুখোমুখি হতে হয় তাকে। ২০০৬ সালে প্রধান শিক্ষক হিসেবে তার প্রমোশন হয়। অতঃপর ২০০৯ খ্রি: উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক এবং ২০১৩ সালে সিলেট জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হন। এর পুরষ্কার হিসাবে ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে “একাডেমিক সুপারভিশন এন্ড প্রফেশনাল ডেভেলপম্যান্ট অব টিচার্স ট্রেনিং” গ্রহণে ৭ দিনের জন্য মালেশিয়ায় যান এবং ট্রেনিং সম্পন্ন করে ফিরে আসেন। গোলাপগঞ্জ উপজেলায় যোগদানের পরও ইংরেজী বিষয়ে মাস্টার ট্রেইনার হওয়ার পাশাপাশি সংগীত বিষয়েও মাস্টার ট্রেইনার হিসাবে নিয়োগ পান এবং অনেকগুলো ব্যাচ করানোর সুযোগ হয় তার। এই সময় ব্রিটিশ কাউন্সিল থেকে ‘ইটিটিই’ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ২০০৮ সালে বিভাগীয় আদেশে বদলী হয়ে গোলাপগঞ্জ উপজেলার ঘোষগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। অদ্যাবধি এই স্কুলেই কর্মরত আছেন।
চিরশ্রী পৈত্য বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের পড়ানোর জন্য সি.আর.পি. থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং তা তার কর্মক্ষেত্রে কাজে লাগিয়ে অনেক ভাল ফলাফল পান যা সি.আর.পি. এর মনিটরিং সেলের রিপোর্টে উঠে এসেছে। তার বিদ্যালয়ে ঝরে পড়ার হার ০% , প্রাথমিক সমাপনি পরীক্ষায় শতভাগ পাশ, প্রাথমিক মেধা বৃত্তি প্রাপ্তি, শিষ্টাচার, সময়ানুবর্তিতা সব মিলিয়ে উপজেলার প্রথম সারির একটি স্কুল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত তার বিদ্যালয়। তিনি বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার অধীনে পরিচালিত একটি প্রজেক্টের মাধ্যমে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের পরিচালনার জন্য টি.ও.টি. প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং মাস্টার ট্রেইনার হিসেবে নিয়োগ পেয়ে উপজেলার প্রায় সব বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের এই ব্যাপারে প্রশিক্ষণ প্রদান করেন। চাকুরিকালীন অবস্থায় বিষয় ভিত্তিকসহ অনেকগুলো ট্রেনিং করার সুযোগ পান এবং সফলতার সাথে সে সব প্রশিক্ষণ সমাপ্ত করেন। মহান সৃষ্টি কর্তার নিকট তার একটাই চাওয়া চাকুরী জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত যেন সুস্থ্য শরীরে প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে নিজেকে নিয়োজিত রেখে সফলভাবে কর্ম জীবন শেষ করতে পারেন।
পল্লী গ্রামে নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করে জীবনের প্রতিটি মূহূর্তে আর্থিক, সামাজিক, পারিবারিক, পারিপার্শ্বিক, অনেক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন, প্রতিকুলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে থেমে না গিয়ে সমাজে উদাহরণ সৃষ্টি করায় আজ চিরশ্রী পৈত্য শিক্ষা ও চাকুরী ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী।
সফল জননীর কৃতিত্ব অর্জনকারী নারী ক্যাটাগরীতে শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী মোছাঃ গুলরাজ বেগম সিলেট সিটি কর্পোরেশনের কেওয়া পাড়া নিবাসী মৃত মোঃ হিবজুর রহমানের স্ত্রী। ১৯৬২ সালে সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর উপজেলার ভাটি অঞ্চল তাহিরপুর গ্রামে মোছাঃ গুলরাজ বেগমের জন্ম। তিনি লাল মিয়া ও সুরত নেছার ১ম সন্তান। গুলরাজ বেগম ১৯৬৯ খ্রিঃ সফলভাবে প্রথম শ্রেণি শেষ করে দ্বিতীয় শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন, কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস; মাত্র ১০/১৫ দিন ক্লাস করার সুযোগ পান, এরই মধ্যে হঠাৎ করে গুলরাজের মা মারা যান। তখন গুলরাজের মেঝো বোনের বয়স মাত্র ৩ বছর আর ছোট বোনের বয়স মাত্র ৬ মাস। মায়ের মৃত্যুতে গুলরাজদের পরিবারে নেমে আসল ঘণকালো অন্ধকার। যখন খেলার সাথীদের সাথে খেলাধুলা করার কথা, তখন গুলরাজের সময় কাটে ছোটো বোনদের দেখা শোনা করা ও বাবার বাড়ি ফেরার অপেক্ষায়। সন্ধ্যায় বাবা (লাল মিয়া) বাড়িতে এসে মেয়েদের ঘরে নিয়ে কেরোসিন তেলের বাতি জ্বালিয়ে তাঁদের হাত মুখ ধুইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিতেন। সারাদিনের ক্লান্ত ছোট্ট শিশুগুলো নিমিষেই ঘুমিয়ে পরত। এদিকে তাঁদের বাবা রান্না করে আবার তাঁদেরকে ঘুম থেকে জাগিয়ে ভাত খাওয়াতেন। পরের দিন আবার তাঁদের সংগ্রাম শুরু হতো।
সন্তানদের এই করুণ দুর্দশা দেখে লাল মিয়া দ্বিতীয় বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন। এবার যেন গুলরাজের জীবনে আরেক যুদ্ধক্ষেত্র শুরু হলো। সৎ মায়ের গলিরাজ ও তার বোনদের সাথে খারাপ ব্যবহার, সংসারে অশান্তির ভয়ে গুলরাজ সব কিছু নিরবে সহ্য করতেন। সৎ মায়ের আত্যাচার থেকে ভালো রাখার আশায় অল্প বয়সে গুলরাজের বাবা তাকে বিয়ে দেন পার্শ্ববর্তী গ্রামের ফজলুর রহমানের ছেলে সরকারী চাকুরীজীবী হিফজুর রহমানের সাথে। বিয়ের পর শুরু হয় গুলরাজের সংগ্রামী জীবনের আরেক অধ্যায়। একদিকে মা মরা দুটি বোন রেখে এসেছেন সৎ মায়ের কাছে, অন্যদিকে স্বামীর সংসারের মানুষজন ছিল অশিক্ষিত, হিংসুটে এবং ঝগরাটে। সেখানের পরিবেশটা এমন ছিলো যেন সব কিছু তাকে মানিয়ে চলতে হতো।
বিয়ের বেশ কিছুদিন পর তাঁর স্বামী, তাঁর মা ও ভাইকে বুঝিয়ে গুলরাজকে সাথে নিয়ে কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। প্রত্যন্ত তাহিরপুর থেকে সুনামগঞ্জ যাওয়ার জন্য কোনো যানবাহন ছিলোনা, তাই তারা পায়ে হেঁটে সুনামগঞ্জ যান। সেখানে গিয়ে একটি রিক্সা ভাড়া করেন তার স্বামী। ঘর থেকে জীবনের প্রথম বাইরে বের হওয়া গুলরাজ জীবনে প্রথম দেখা বাহনটির নিচে বসে গেলেন; কারণ রিক্সায় কিভাবে চড়তে হয় তা তিনি জানতেন না। তাঁর স্বামী তাঁকে হাত ধরে রিক্সার সিটে বসালেন।
গুলরাজের স্বামীর সীমিত উপার্জনে হয়তো তাঁদের ভালোই কেটে যেত, কিন্তু তাঁর ভাসুর/ শাশুরী মাস শেষ হওয়ার পূর্বেই বাসায় চলে আসতেন বেতনের এক-তৃতীয়াংশ টাকা নেওয়ার জন্য। মা/ভাই -বোনের ব্যাপারে অন্ধ গুলরাজের স্বামী, হাসি মুখে সব কিছু মেনে নিতেন। পরে তাঁরা চলতেন খুব কষ্ট করে।
গুলরাজকে দুটি কাপড় পড়ানোর সামর্থ ছিলনা তাঁর স্বামীর। তার শশুর বাড়ির লোকজন বেশি দিন তাকে তাঁর স্বামীর সাথে থাকতে দেয়নি। বাড়িতে নেয়ার পর গুলরাজের সময় কাটে সংসারের কাজ আর ভাশুরের ছেলেমেয়েদের দেখাশুনা করে। তিনি কিছু দিন পর প্রথম এক কন্যা সন্তানের মা হন। দুই বছর পর আরো একটি কন্যা সন্তানের মা হন। এরপর দুটি ছেলে ও চারটি মেয়ে জন্মগ্রহণ করে। গুলরাজের স্বামী তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের কর্মস্থলে নিয়ে যান। বেশ কিছুদিন পর গুলরাজের বড় ছেলেটি কিডনি সমস্যা জনিত কারণে হঠাৎ মারা যায়। সন্তান হারিয়ে গুলরাজের শারীরিক অবস্থার অবনতি দেখা দিলে ডাক্তারী পরামর্শ মোতাবেক তাকে স্বপরিবারে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। বাড়িতে নিয়ে তাঁর মেয়েদেরকে স্কুলে ভর্তি করে দেয়া হয়। বর্ষা মৌসুমে অনেক কষ্ট করে মেয়েরা স্কুলে যেতো। তিনি যখন তাঁর মেয়েদেরকে সন্ধ্যায় পড়াতে বসাতেন, তখন তাঁর শশুর বাড়ির লোকজন হারিকেনের তেল অপচয় হচ্ছে বলে হাজার কথা শুনাতো। গুলরাজ তাঁর মেয়েদের লেখাপড়ার সময় পরিবর্তন করে ভোর ৩টায় ঘুম থেকে ডেকে তুলে মুখ ধুইয়ে পড়তে বসাতেন। শশুর বাড়ির লোকজন তাকে নানা ভাবে অত্যাচার করত।
কিছুদিন পর আবার তার স্বামী যখন তাঁদেরকে কর্মস্থলে নিয়ে যান, সেখানে থাকার ঘর থেকে রান্না ঘর কিছুটা দূরে ছিলো। গুলরাজ যখন রান্না ঘরে কাজ করতেন তখন তিনি তাঁর মেয়েদেরকে রান্না ঘরের এক পাশে চটের বস্তা বিছিয়ে পড়তে বসাতেন। মেয়েদের লেখাপড়া করানোর বিষয়ে তাঁর স্বামীর কোনরূপ অনীহা ছিলোনা। স্বামীর সহযোগিতা এবং ভালোবাসায় আর তার একান্ত প্রচেষ্টায় প্রত্যন্ত গ্রামের সে গুলরাজকে আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি।
তার প্রবল ইচ্ছে থাকা স্বত্ত্বেও শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন, তিনি তাঁর সন্তানদের সে আলো থেকে বঞ্চিত হতে দেননি। ১৯৯৪ খ্রিঃ যখন গুলরাজের প্রথম মেয়ে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় প্রথম স্থান লাভ করে সেই খুশিতে গুলরাজের স্বামী মণ খানেক মিষ্টি বিতরণ করেন। একে একে সব সন্তানকেই তিনি শিক্ষার আলোয় আলোকিত করে গড়ে তুলেন।
গুলরাজ বেগমের প্রথম সন্তান হাফছা আক্তার-বিএ পাশ করে সিলেট নগরীর দর্শন দেউরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক। দ্বিতীয় সন্তান ছালমা আক্তার সুনামগঞ্জ জেলার দরাকুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তৃতীয় সন্তান হাফিজ মোঃ আবু ছালেহ, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পুলিশে এএসআই পদে কর্মরত। চতুর্থ সন্তান সাবিহা আক্তার সিলেট নগরীর দর্শন দেউরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক।
পঞ্চম সন্তান হালিমা আক্তার সিলেট নগরীর টুকেরবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি অর্থনীতি বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স (ফার্স্ট ক্লাস) করেন। পরবর্তীতে তিনি উচ্চ শিক্ষার জন্য ২০২৩ সালে স্বামীর সাথে লন্ডনে যান। সেখানে তিনি আলস্টার ইউনিভার্সিটি লন্ডন ক্যাম্পাস থেকে এম এস সি ইন ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস উইথ হিউমেন রিসোর্স উইথ এডভান্সড প্র্যাকটিস বিষয়ে পুনরায় মাস্টার্স করেন। তিনি বর্তমানে লন্ডনের সাউথ ওয়েস্টার্ন রেইলওয়েতে কাস্টমার সার্ভিস এসিস্ট্যান্ট হিসেবে লন্ডন ওয়াটারলু স্টেশনে কর্মরত।
ষষ্ঠ সন্তান খাদিজা সুলতানা সিলেট নগরীর দরগাহ জালালীয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়য়ের সহকারী শিক্ষক। সপ্তম সন্তান আয়শা সিদ্দিকা, ইংলিশে অনার্স, মাস্টার্স শেষ করে স্বামীর সাথে লন্ডনে অবস্থান করছেন। তিনি সেখানে সহকারী শিক্ষক হিসেবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত।
গুলরাজ বেগমের জীবন চলার পথটা মোটেও সহজতর ছিলনা। জীবনের প্রতি পদে পদে তাকে অনেক বাঁধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। তবু নিজের মনের জোর আর প্রবল ইচ্ছা শক্তির কারণে তাকে থামাতে পারেনি কেউ। ছেলে মেয়েদের বড় করে বর্তমানে গুলরাজ বেগম ছেলের বাসায় নাতি- নাতনিদের নিয়ে পরম আনন্দে বসবাস করছেন।
জীবন সংগ্রাম শেষে তিনি একজন সফল মা হতে পেরেছেন। স্বামীর সহযোগিতা নিয়ে জীবনের সব শখ বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করায় গুলরাজ বেগম সফল জননী শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী।
নির্যাতনের দুঃস্বপ্ন মুছে জীবন সংগ্রামে জয়ী নারী ক্যাগরিতে শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী পারভীন আক্তার বিয়ানীবাজার উপজেলার নাটেশ^র গ্রামের কৃষক মোঃ আব্দুল জলিল ও মাতা আনোয়ার বেগম এর ৬ ছেলেমেয়ের মধ্যে ৩য় সন্তান। দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় খুব কষ্ট করে পড়ালেখা করতে হয়েছে। মেয়ে হয়ে বাবার সাথে কৃষি কাজে সাহায্য করেছেন ও টিউশনি করে যে টাকা আয় করেছি সেই টাকা দিয়ে ভাই বোনের পড়ালেখার খরচে ব্যয় করতেন। তিনি জকিগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ২০০৩ ইং সালে এস এস সি পরীক্ষার পর টাকার অভাবে লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। পরীক্ষার পর তিন মাস লেডিস সেলাই প্রশিক্ষণে গ্রহণ করেন। প্রাইভেট পড়ানো টাকা থেকে সঞ্চয়কৃত টাকা দিয়ে ১টি সেলাই মেশিন কিনে কাজ শুরু করেন। সেলাই করে যে টাকা আয় হতো তা পরিবারের পিছনে ব্যয় করেছেন।
২০০৫ সালে নাটেশ্বর গ্রামের ইউসুফ আলীর সাথে পারভীন আক্তারের বিবাহ হয়। বিবাহের কয়েক মাস পর এক লক্ষ টাকা যৌতুক দাবি করে তার স্বামী। তার বাবার পারিবারিক অবস্থা খারাপ থাকায় তিনি এক লক্ষ টাকা যৌতুক দিতে অস্বীকার করেন এতে তার শাশুড়ী ও স্বামী তাকে শারীরিক ও মানষিক ভাবে নির্যাতন শুরু করে। শারীরিক নির্যাতনের কারণে তার শরীর থেকে রক্ত ঝরেছে। বাবার আর্থিক অবস্থা ভালো না থাকার কারণে পারভীন আক্তার ধৈর্য্য ধরে সংসার চালিয়ে গেছেন।
বিয়ের ২ বছর পর প্রথম ছেলে সন্তান জন্ম হয়। এরপর আরো ২টি মেয়ে ও ১টি ছেলের জন্ম হয়। ধীরে ধীরে সংসার বড় হওয়ায় এবং স্বামী বেকার থাকার কারণে তাদেরকে যৌথ পরিবার থেকে আলাদা করে দেওয়া হয়। এমতাবস্থায় সংসারের ভরণ পোষণ ও বাচ্চাদের পড়ালেখা খচর বহন করতে পারভীন আক্তার সেলাইয়ের কাজ শুরু করেন। সেলাইয়ের কাজ থেকে যে আয় হয় তা দিয়ে ৪ ছেলে মেয়ের খাওয়া-দাওয়া, পোশাক, পড়ালেখার খরচ বহন শেষে একটি বিদ্যুৎ চালিত সেলাই মেশিন, লক মেশিন ও বাটারফ্লাই মেশিন কিনেন। পাশাপাশি তিনি মেয়েদের দর্জি প্রশিক্ষণ দেন। স্বামী বেকরত্ব দূর করতে তিনি চারখাই বাজারে একটি লেপ-তুষকের দোকান ও তুলা দুনার জন্য মেশিন স্বামীকে কিনে দেন।
পারভীন আক্তার ও তার স্বামী দু’জনে উপার্জন করায় বর্তমান তাদের সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরে এসেছে। অনেক বাধ্যবাধকতা অতিক্রম করে এ পর্যায় পারভীন আক্তার আসতে পেরেছেন। তিনি চান তার মত নির্যাতিত মেয়েরা যেন সংগ্রাম করে নতুন জীবন গড়তে পারে। প্রতিটি নারী যেন স্বামীর সংসারে থেকে তার মত জীবন যুদ্ধ করে জয়ী হয় এই প্রত্যাশা। তিনি একজন নির্যাতিত সংগ্রামী মহিলা হিসেবে মাথা উচু করে দাড়িয়েছেন।
সকল সমস্যাকে পিছনে ফেলে একা সামনে এগিয়ে যাওয়া শিখেছেন। স্বামী-সন্তানদের নিয়ে আনন্দে দিন কাটাচ্ছেন। পারভীন আক্তার ভাবেন তিনি নারী, তিনি সাহসী, তিনি অপরাজিতা। তাই তিনি শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী।
সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন যে নারী ক্যাগরীতে শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী রিফাত আরা রিফা গোলাপগঞ্জ উপজেলার আমকোনা গ্রামের মোহাম্মদ আলাউদ্দিন ও রোশনা আলাউদ্দিন এর মেয়ে। বর্তমানে ৫০ শুভেচ্ছা, গ্রীনহোম, হাউজিং এস্টেট, আম্বরখানা, সিলেটের বাসিন্দা। তিনি ছোটবেলা থেকেই বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন একজনের সাথে বড় হওয়ায় তাদের মত বাচ্চাদের সাথেই কেটেছে তার শৈশবকাল। তার পিতা জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একজন সাবেক যুগ্ম সচিব ছিলেন এবং মাতা একজন গৃহিনী । তাঁর স্বামী নূর উদ্দিন আহমদ বর্তমানে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগের একজন অধ্যাপক। তিনি দুই সন্তানের জননী। ২০১৬-২০১৭ সালে আমেরিকর একটি প্রতিষ্ঠানে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেছেন। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ ফিরে এসে দেশের মানুষের জন্য সেচ্ছাসেবী হয়ে কাজ শুরু করেন। তিনি এমবিএ পাস হওয়ার সুবাদে সিলেটের একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে এইচ.আর হিসেবে যোগদান করেন। তিনি সিলেটের মুহিবুর রহমান স্কুলে সহকারি শিক্ষক হিসেবে চাকুরী করেছেন। ২০২০ সালে করোনার সময় সমাজের নানা সমস্যা নিয়ে লাইভ প্রোগামের মাধ্যমে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে কাজ করেন।
রিফাত আর রিফা ৪এম টিভি ইউএসএ-তে কাজ করে অনেক মানুষের কর্মস্থান তৈরী করেছেন। সেই সময় তাঁর করা প্রবাসীর মন অনুষ্ঠানটি সকলের কাছে প্রশংসা লাভ করে। বড় বোন আফসানা আলাউদ্দিন প্রতিবন্ধী থাকায় অটিজম বিষয় নানা কোর্স করেন এবং সেখানেই পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করছেন। আমেরিকার ডাঃ জেননিফার ডাসটয়-এর ফাউন্ডেশনেও কাজ করছেন। সকলের সহযোগিতায় তিনি সফল হতে পেরেছেন। অটিজম বিষয়ে এখনো পড়ালেখা করছেন।
২০২০ সালে আমেরিকা যে স্কুলে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন, বার্তমানে তিনি সেখানের একজন সম্মানিত বোর্ড অফ ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করছেন। রিফাত আর রিফা একমাত্র প্রথম বাঙালি বোর্ড মেম্বার। এছাড়াও তিনি বাংলাদেশ বেতার, সিলেট কেন্দ্রের একজন নিয়মিত অনুষ্ঠান ঘোষিকা ও এফএম ৯০ মোগাহর্জ (রেডিও জেককী) কর্মরত আছেন। তিনি ২০২১ সাল থেকে রিফাতস্ সোস্যাল স্টুডিও নামক ফেইসবুক পেইজের মধ্যে অটিজম বিষয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান সহ সমাজের নানা সুবিধা ও অসুবিধা নিয়ে বিশেষজ্ঞ আলোচক এনে সবাইকে জানার সুযোগ করেছেন।
সমাজ উন্নয়নে এ পর্যন্ত রিফাত আরা রিফা যে কাজগুলো করেছেন তা হচ্ছে- নাম দস্তখত শিখানোর পথশিশুর সংখ্যা প্রায় ২২০ জন এবং নিজ খরচে খাবার পরিবেশন করেছেন প্রায় ২ লক্ষ টাকার, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অসহায় মানুষদের চাকুরী দিয়ে সহায়তা করেছেন ৫৬ জনকে। বিনা পারিশ্রমিকে চিল্ডেন অব দ্যা ওয়াল্ড কোঅপ্ট এর বোর্ড অফ ডিরেক্টরস হিসেবে কর্মরত, ২০২০ সালে করোনার সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রায় ৬০০টিরও বেশি প্রোগ্রাম করে মানুষকে সচেতন করেছেন। হতাশা ও আত্মহত্যার পথ থেকে সচেতন করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে এনেছেন ০৬ জনকে, মানসিক ও স্বাস্থ্য সচেতনতা বিষয়ক স্কুল ক্যাম্পইন, আমেরিকান কর্ণার, সিলেট এর মাধ্যমে ৬০০টিরও বেশী প্রোগ্রামের মাধ্যমে প্রায় ১০,০০০ জনের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা। এলোহা অটিজম ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে ১১১জন অটিজম বাচ্চার বাবা-মায়েদেরকে পরামর্শ প্রদান চলমান রয়েছে। প্রতিবন্ধী বাচ্চাদের যারা গান ও আবৃত্তি জানের তাদেরকে বাংলাদেশে বেতার, সিলেট কেন্দ্র প্রোগ্রাম করার ও সম্মানী পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছেন প্রায় ১৪ জনকে। তারা নিয়মিত অনুষ্ঠান করেন এবং সম্মানী পেয়ে থাকেন। তিনি প্রায় ২০জনের মধ্যে বিনামূলে বিশটি হুইল চেয়ার বিতরণ করেছেন। নিজস্ব অর্থায়নে এই পর্যন্ত প্রায় ১০০জনকে শীবতস্ত্র দিয়েছেন। ৬ জন অসহায় দুঃস্থ রোগীকে প্রায় ৫০ হাজার টাকা নগদ অর্থ দিয়ে চিকিৎসা সেবা গ্রহণের সুযোগ করেছেন। অটিজম, মানসিক স্বাস্থ্য, নারীদের সামাজিক সমস্যা নিয়ে প্রতিনিয়ত জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকা এবং অনলাইন পত্রিকায় সচেতনতা বৃদ্ধিতে লিখে যাচ্ছেন। তাছাড়া গৃহকর্মের কাজও নিজের হাতে করে থাকেন।
রিফাত আর রিফা নিজের আয় ও পরিবারের আত্মীয়দের আর্থিক সহযোগিতায় গরীব মেয়ের বিয়ে, শীত বস্ত্র, হুইল চেয়ার, রিক্সা-ভ্যান, এতিমখানায় খাবার প্রদান, প্রতিবন্ধী সংস্থায় আর্থিক সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছেন। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে অনেকেই আত্মহত্যা করার মত মন মানসিকতা থেকে ফিরে এনেছেন।
উপরোক্ত কাজগুলোর মাধ্যমে সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখার স্বীকৃতি স্বরূপ রিফাত আর রিফা শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী সম্মাননা লাভ করেছেন।
মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর সিলেটের উপপরিচালক শাহিনা আক্তার বলেন, প্রতি বছরের ন্যায় এবছরও মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়াধীন মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মাধ্যমে তৃণমূলের সংগ্রামী নারীদের উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত করার লক্ষ্যে প্রতিবছর জীবনযুদ্ধে জয়ী নারীদের স্বীকৃতি প্রদানের জন্য ‘অদম্য নারী’ শীর্ষক কার্যক্রমের ধরাবাহিকতায় সিলেটে জেলা পর্যায়ে নির্বাচিত ৫ জন শ্রেষ্ঠ অদম্য নারীকে সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। আগামীতেও মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী সম্মাননা প্রদান অব্যাহত থাকবে।

Manual6 Ad Code

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ