ঢাকা ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১লা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১১:০৯ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ২২, ২০২৫
প্লেটো আড়াই হাজার বছর আগে যে সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছিলেন, আজকের বাংলাদেশে তা যেন অস্বস্তিকর বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে। গণতন্ত্রের নামে লাগামছাড়া সহিংসতা, মতাদর্শের নামে নৃশংসতা এবং রাজনৈতিক স্বার্থে রাষ্ট্র ও সমাজকে জিম্মি করার প্রবণতা—সব মিলিয়ে দেশ দাঁড়িয়ে আছে এক গভীর সংকটের মোড়ে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়; বরং আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে একটি পরিকল্পিত অস্থিরতার ইঙ্গিত বহন করে।
শুক্রবার মধ্যরাতে লক্ষ্মীপুরের চরমনসা গ্রামে বিএনপি নেতা বেলাল হোসেনের বাড়িতে তালা লাগিয়ে আগুন দেওয়া কেবল রাজনৈতিক সহিংসতা নয়—এটি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। আগুনের মধ্যে আটকে পড়ে ছোট্ট আয়শার “আব্বু আমাকে নাও” আর্তচিৎকার সভ্য সমাজকে স্তব্ধ করে দেয়। রাজনৈতিক বিরোধ কি শিশু হত্যার পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে? যদি পারে, তবে আমরা কোন পথে হাঁটছি?
এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে ভালুকায় পোশাকশ্রমিক দিপু চন্দ্র দাসকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা, বিবস্ত্র করে ঝুলিয়ে মরদেহে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনা আমাদের আরও স্পষ্ট করে দেখিয়ে দেয়—রাষ্ট্রের অনুপস্থিতিতে উগ্রবাদ কতটা নিষ্ঠুর রূপ নিতে পারে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই বা আইনের আশ্রয় না নিয়ে ধর্মীয় আবেগের নামে প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ড সভ্যতার বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে। প্রশ্ন তাই একটাই—রাষ্ট্র কোথায়, আইন কোথায়, আর এই উন্মত্ততাকে কারা উসকে দিচ্ছে?
বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরার ঘোষণা এবং নির্বাচন ও গণভোটের সময়সূচি ঘোষণার পরপরই সহিংসতার মাত্রা বেড়ে যাওয়া কাকতালীয় বলে মনে হয় না। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের ভাষায়, একটি মহল পরিকল্পিতভাবে নির্বাচন বানচালের লক্ষ্যে অস্থিরতা তৈরি করছে। এই অস্থিরতার উদ্দেশ্য দ্বিমুখী—একদিকে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করা, অন্যদিকে সমাজে ভয় ও বিভাজন ছড়িয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে অকার্যকর করে তোলা।এবং সংবাদমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক পরিসরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এই তিন ক্ষেত্রেই ব্যর্থতা মানে শুধু একটি নির্বাচন নয়, বরং পুরো রাষ্ট্রকাঠামোর জন্য হুমকি।
ছোট্ট আয়শার পুড়ে যাওয়া শরীর, দিপু দাসের ঝুলন্ত মরদেহ, পত্রিকা অফিসে আগুন—এসব কেবল সংবাদ নয়, এগুলো ভবিষ্যতের অশনিসংকেত। নির্বাচন বানচাল হোক বা না হোক, যদি সহিংসতার এই রাজনীতি থামানো না যায়, বাংলাদেশ হারাবে তার সবচেয়ে বড় অর্জন—মানবিকতা ও সহাবস্থান।
প্রশ্ন এখন একটাই—রাষ্ট্র কি সময়মতো সাহসী হবে, নাকি ইতিহাস আবারও লিখবে আমাদের ব্যর্থতার গল্প?
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: niazjournalist@gmail.
Design and developed by sylhetalltimenews.com