চীনের অর্থনৈতিক করিডোরে যুক্ত হতে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ কোথায়

প্রকাশিত: ২:৫৫ অপরাহ্ণ, জুলাই ৩, ২০২৬

চীনের অর্থনৈতিক করিডোরে যুক্ত হতে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ কোথায়

Manual8 Ad Code

এবার চীনের কুনমিং থেকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশ পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক করিডোর করার প্রস্তাব সামনে এনেছে বেইজিং। কিন্তু এই প্রস্তাব কার্যকর করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও চীন, দুই দেশের জন্যই মিয়ানমার কেন্দ্রিক ও ভূ-রাজনীতির অনেক চ্যালেঞ্জ দেখছেন কূটনীতি বিশ্লেষকদের অনেকে।

প্রস্তাবটি এসেছে চীনের শীর্ষ নেতার কাছ থেকে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ২২ জুন থেকে যখন তিন দিনের সফরে চীনে ছিলেন, তখন তার সঙ্গে বৈঠকে অর্থনৈতিক করিডোরের ওই প্রস্তাব দিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।

যদিও বাংলাদেশ করিডোরের প্রস্তাবের ব্যাপারে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি। কিন্তু বাংলাদেশও চীনের সঙ্গে অর্থনীতির ব্যাপ্তি ও যোগাযোগ বাড়াতে চায়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বুধবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, সরকার প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করে দেখছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন আরেকটি সূত্র বলেছে, বাংলাদেশ সরকার চীনের প্রস্তাবকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে।

 

 

তবে আলোচনায় আসছে ভূ-রাজনীতির চ্যালেঞ্জের প্রশ্ন। কূটনীতি বিশ্লেষকেরা বলছেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত, ভারতের অবস্থান সেখানে একটি বড় বিষয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া কি হতে পারে, সেটাও বিবেচনায় রেখে বাংলাদেশকে এগোতে হবে।

বাংলাদেশে তিস্তাসহ বিভিন্ন নদীর ব্যবস্থাপনা প্রকল্পেও সহায়তা করতে চেয়েছে চীন। দেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষিখাতের স্বার্থে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারও যেকোনো মূল্যে তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চায়। এ ক্ষেত্রেও রয়েছে আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির চ্যালেঞ্জ।

চীনের প্রস্তাবগুলোকে অবশ্য বাংলাদেশের অর্থনীতির স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে দেশের কূটনীতি ও রাজনৈতিক অঙ্গনে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে দুই দেশের পক্ষ থেকেই ‘দীর্ঘমেয়াদী অংশীদারিত্ব ও কৌশলগত’ সম্পর্ক তৈরি হওয়ার কথা বলা হয়েছে।

 

 

বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, দেশ দুটির মধ্যে রাজনৈতিক শীর্ষ পর্যায়ে একটা বোঝাপড়া হয়েছে এবং এ বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তারা বলছেন, এখন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ সামলানোর বিষয়টি নির্ভর করবে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সক্ষমতা ও দূরদর্শিতার ওপর।

অর্থনৈতিক করিডোরের সম্ভাব্য রুট কী

চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিং থেকে শুরু হবে এই করিডোর। সেটি যাবে মিয়ানমারের মান্দালয়ে। সেখান থেকে করিডোরের একটি অংশ মিয়ানমারের ইয়াঙ্গন এবং অন্য অংশ বিস্তৃত হবে রাখাইন রাজ্যের কিয়াউকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত।

মিয়ানমারের রাখাইন থেকে সংযোগটি সড়ক ও রেল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বাংলাদেশের কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের সঙ্গে যুক্ত হবে। চীনের পক্ষ থেকে এমন সম্ভাব্য রুটের প্রস্তাব রয়েছে বলে ঢাকায় সংশ্লিষ্ট সরকারি একাধিক সূত্রে জানা গেছে। এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও যোগাযোগের রুট হিসেবে চীনের করিডোর তৈরির প্রস্তাব এর আগেও বিভিন্ন সময় আলোচনায় এসেছে।

 

‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’, চীনের এই প্রকল্প বিসিআইএম নামে পরিচিত। বাংলাদেশ-চীন-ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে অর্থনৈতিক করিডোরের প্রস্তাব একযুগেরও বেশি সময় আগে ২০১৩ সালে সামনে এনেছিল বেইজিং।

Manual1 Ad Code

কিন্তু ভারতের আপত্তির কারণে তখন তা এগোয়নি। পরে ভারতকে বাদ দিয়েই চীন মিয়ানমারের সঙ্গে অর্থনৈতিক করিডোর তৈরির পরিকল্পনা করে, তাতে বাংলাদেশকে যুক্ত করার বিষয়টি আসে। এখন চীন সম্ভাব্য সেই প্রস্তাব বাংলাদেশকে দিয়েছে বলে জানা গেছে।

Manual6 Ad Code

ভেতরের চ্যালেঞ্জ

ভেতরে-বাইরের ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের কথা বলছেন কূটনীতি বিশ্লেষকরা। ভেতরের চ্যালেঞ্জ বলতে তারা বোঝাচ্ছেন মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংকটকে। মিয়ানমারের জান্তা সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘাত চলছে ‘বিদ্রোহী’ আরাকান আর্মির। বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন রাখাইনের বড় অংশ রয়েছে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে।

 

 

অন্যদিকে রয়েছে রোহিঙ্গা সমস্যা। মিয়ানমারে নির্যাতনের কারণে সীমান্ত দিয়ে পালিয়ে বাংলাদেশে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়ে আছে বেশ কয়েক বছর ধরে। এই দুটি সংকটের সমাধান না হলে করিডোরে বাংলাদেশকে যুক্ত করা কতটা কার্যকর ও নিরাপদ হবে, সেই প্রশ্ন উঠছে। তবে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির মনে করেন, সংকট সা

মলিয়ে করিডোর কার্যকর করার ক্ষেত্রে চীনের ভূমিকাই গুরুত্বপূর্ণ।

 

তিনি বলেন, মিয়ানমারে চলমান সংকট ও রোহিঙ্গা ইস্যু থাকার পরও চীন যদি কার্যকর উদ্যোগ নেয় এবং বাংলাদেশ ইতিবাচক সাড়া দেয়, তাহলে অর্থনৈতিক করিডোর বাস্তবায়ন সম্ভব।

Manual8 Ad Code

‘অর্থনৈতিক করিডোর বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য পরিবর্তনের বিরাট সুযোগ তৈরি করতে পারে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ একদিকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হতে পারবে। একইসঙ্গে বাংলাদেশ যুক্ত হতে পারবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১০টি দেশের জোট আসিয়ানের সঙ্গে। ফলে বাংলাদেশের জন্য এক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যাবে।’

 

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও বলা হচ্ছে, এই করিডোর কার্যকর হলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয় চীনের বিনিয়োগ বেড়ে যাবে। চীনসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোয় বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ সহজ হবে। পণ্য পরিবহণে সময় ও ব্যয়, দুটোই উল্লেখযোগ্যহারে কমে যাবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় তার উপদেষ্টা মাহদী আমিন সংবাদ সম্মেলন করে সেই সফরের বক্তব্য তুলে ধরেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘অর্থনৈতিক করিডোরের উদ্দেশ্য হবে, বাংলাদেশের অর্থনীতির ব্যাপ্তি বাড়ানো, মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্টেশনকে আরও সমৃদ্ধ করা।’

সেই সফরের আলোচনা নিয়ে যে যৌথ বিবৃতি দেওয়া হয়েছে এবং চীনের প্রেসিডেন্টের বক্তব্য যা এসেছে, তাতে অর্থনৈতিক করিডোর এগিয়ে নেওয়ার প্রশ্নে জোর দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ও চীন, দুই দেশই এ ব্যাপারে আগ্রহী। তবে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সমস্যগুলো সমালিয়ে কিভাবে তা এগিয়ে নেওয়া যাবে, সেই আলোচনা যেমন আছে, একইসঙ্গে আসছে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির চ্যালেঞ্জের প্রশ্ন।

Manual1 Ad Code

ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ কতটা

এক যুগেরও বেশি সময় আগে যখন ভারতসহ অর্থনৈতিক করিডোরের প্রস্তাব করেছিল চীন, তখন ভারতের আপত্তির কারণে সেই উদ্যোগ স্থবির হয়ে পড়েছিল। কারণ এই অঞ্চলে প্রভাব নিয়ে চীনের সঙ্গে ভারতের যে দ্বন্দ্ব এবং এর জেরে আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে তাদের যে সমীকরণ, তাতে এ ধরনের কোনো করিডোরে ভারতের প্রতিক্রিয়া ছিল বলে বিশ্লেষকেরা বলছেন।