বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না সুনামগঞ্জের বিএনপি নেতা কামরুজ্জামান কামরুলের

প্রকাশিত: ৮:২৯ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ২২, ২০২৫

বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না সুনামগঞ্জের বিএনপি নেতা কামরুজ্জামান কামরুলের

বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না সুনামগঞ্জের বিএনপি নেতা কামরুজ্জামান কামরুলের। নানা ঘটনায় আলোচিত হচ্ছেন তিনি। সুনামগঞ্জ-১ আসনে মনোনয়ন চেয়েও পাননি। দলের ঘোষিত প্রার্থীকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে মাঠে রয়েছেন। এতে তাকে নিয়ে নতুন বিতর্ক দেখা দিয়েছে। তার কর্মকাণ্ডকে ভালো চোখে নিচ্ছেন না দলীয় নেতাকর্মীরাও। এবারের ডিগ্রি পরীক্ষায় পরীক্ষার্থীর তালিকায় আছে তার নাম। লন্ডনে থেকে তিনি কীভাবে পরীক্ষায় অংশ নিলেন সেটি নিয়ে চাঞ্চল্যের জন্ম হয়েছে। কামরুজ্জামান কামরুল সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপি’র সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। তিনি তাহিরপুর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান। এ আসনে বিএনপি এবার মনোনয়ন দিয়েছে কৃষক দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক আনিসুল হককে। তাকে ঘিরেই এখন আবর্তিত হচ্ছে এ আসনের বিএনপি’র রাজনীতি। এই অবস্থায় কামরুলের মাঠে থাকা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এবারের নির্বাচনের ডামাডোলের শুরুতেই কামরুল ছিলেন লন্ডনে। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএ ও বিএসএস পরীক্ষায় সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট সরকারি কলেজ কেন্দ্রে একটি অনিয়মকে ঘিরে সম্প্রতি বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে- বিএনপি’র এক মনোনয়ন বঞ্চিত’র পরিবর্তে তার এক আত্মীয় নিয়মিতভাবে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। সম্প্রতি এমন একটি লিখিত অভিযোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর বরাবর পাঠানো হয়েছে এবং অনুলিপি পাঠানো হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, ডিএসবি ও এনএসআইসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে। এ ঘটনায় সুনামগঞ্জে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে। অভিযোগ সূত্রে জানা যায়- পরীক্ষার্থী মো. কামরুজ্জামান (স্টুডেন্ট আইডি: ২২০২৩৬৩৪০৫০-ব্যাচ ২২), গ্রাম উজান তাহিরপুর, উপজেলা তাহিরপুর, জেলা সুনামগঞ্জ। অভিযোগে বলা হয়েছে- পরীক্ষার সময় তিনি বিদেশে অবস্থান করছিলেন। অথচ রেকর্ড অনুযায়ী তিনি উপস্থিত থেকে পরীক্ষা দিয়েছেন বলে দেখানো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় রেকর্ড অনুযায়ী কামরুজ্জামান ২০২৫ সালের ২০শে সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ইতিহাস দুই বিষয়ের পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত তথ্যে দেখা গেছে তিনি ২৪শে সেপ্টেম্বর লন্ডন থেকে দেশে ফেরেন ও সেদিন সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তার সমর্থিত নেতাকর্মীরা ফুল দিয়ে তাকে স্বাগত জানান এবং লাইভে প্রচার করা হয়। অভিযোগ পত্রে বলা হয়েছে- কামরুজ্জামানের হয়ে দীর্ঘদিন ধরে তার এক আত্মীয় মো. মিজানুর রহমান মিজান পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। বাদাঘাট সরকারি কলেজ উন্মুক্ত শাখার সভাপতি কেন্দ্র সচিব মিসবাহ্‌ উদ্দিন জানিয়েছেন- এ ঘটনায় গত ১৭ই অক্টোবর উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি টিম কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন। এই নামে একজন পরীক্ষার্থী রয়েছে। তবে তার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেট আঞ্চলিক শাখার পরিচালক মো. মোকছেদার রহমান অভিযোগ প্রসঙ্গে জানিয়েছেন- এ সংক্রান্ত একটি অভিযোগ পেয়ে আমাদের প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। গত ১৭ই অক্টোবর কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন তদন্ত টিম। তদন্তের পর বিস্তারিত বলা যাবে। এদিকে- বিএনপি দলীয় মনোনয়ন ঘোষণার দুইদিন আগে সমাবেশে কর্মীর কাছ থেকে দশ লাখ টাকার চেক গ্রহণ করে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন কামরুল। জেলার জামালগঞ্জ উপজেলার সাচনা বাজারে এক সমাবেশে কর্মীর কাছ থেকে দশ লাখ টাকার চেক গ্রহণ করেন তিনি। পরে বিতর্কের মুখে একদিন পর তাহিরপুর উপজেলার একতা বাজারে এই চেক আবার ফেরতও দেন। অথচ ওই চেকদাতার একাউন্টে জমা ছিল মাত্র ৩ হাজার ৮৩৪ টাকা। চেক গ্রহণ এবং ফেরত দেয়ার ঘটনা সুনামগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ছিল তুঙ্গে। সুনামগঞ্জের সবচেয়ে বড় বালু মহাল যাদুকাটা নদী। এ নদীতে অবৈধ বোমা মেশিন, সেভ মেশিন সহ নানা খননযন্ত্র দিয়ে পাড় কেটে বালু উত্তোলন করা হয়েছে বিগত সরকারের সময়েও। ইজারাদার রয়েলিটি আদায়ের নামে গত কয়েক বছর ধরেই অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হচ্ছে। গণ-অভ্যুত্থানের পর কামরুল সহ তাহিরপুর উপজেলার রাজনৈতিক নেতারা আওয়ামী লীগ সমর্থক ইজারাদারদের অতিরিক্ত টোল আদায়ে বাধা দেন। প্রতি ফুট বালু ১৫ টাকার স্থলে ৯ টাকা আদায়ে বাধ্য করা হয় তখনকার ইজারাদারদের। কিন্তু কয়েকদিন নদীতে ৯ টাকা আদায়ের পর আবার ১১ টাকা আদায় করতে থাকে বালুমহালের ইজারাদাররা। ৯ টাকা থেকে ১১ টাকা কামরুলের ইশারায় করা হয়েছে বলে জানান- ব্যবসায়ীরা। এই বালুমহাল ইজারা হয় ভ্যাট-ট্যাক্স সহ একশ’ কোটি ৬ লাখ ২৫ হাজার টাকায়। গেল তিন মাস ধরে এই মহালে প্রতি ফুট বালুর রয়েলিটি আদায় করা হচ্ছে ২০ টাকা করে। এই বালুমহালের বর্তমান ইজারাদার নাসির মিয়া তার ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত। গত ১২ অক্টোবর থেকে একনাগাড়ে ৪ দিন যাদুকাটার পাড় কেটে ১০০ কোটি টাকারও বেশি বালু লুটের ঘটনা ঘটলেও কামরুল এ বিষয়ে কোনো প্রতিবাদ করেননি। 

এ জেলার তাহিরপুর উপজেলার চারটি নৌঘাট খাস কালেকশন নামে কোটি টাকা লুটপাট করা হয়েছে। কাগজপত্রে উপজেলা প্রশাসন খাস আদায় করলেও নদীপথে চাঁদা আদায় করছেন কামরুলের অনুসারী সহ কতিপয় স্থানীয় বিএনপি নেতা। ৫ই আগস্ট সরকার পতনের পর থেকে কামরুলের বিরুদ্ধে নদী ইজারা বাণিজ্য, বালু লুট কান্ড সহ বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে। তাহিরপুর উপজেলা বিএনপি নেতা জুনাব আলী ও তার ভাই আলী আহমদের মাধ্যমে শান্তিপুর নদী বালুমহাল, শ্রীপুর বাজার, ড্রাম্পের বাজার, বড়ছড়া, চারাগাঁও এবং বাগলী কয়লা শুল্ক স্টেশন, ফাজিলপুর বিআইডব্লিউটিএ, ঘাগড়া নৌকাঘাট ও জলমহাল থেকে অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ারও অভিযোগ রয়েছে। সাবেক ইজারাদার রতন মিয়ার কাছ থেকেও তিনি দৈনিক প্রয় ১০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মো. কামরুজ্জামান কামরুল সব অভিযোগ অস্বীকার করে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন- আমি এবার পরীক্ষা দিচ্ছি না। বিষয়টি নিয়ে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। তিনি বলেন- বালু চেক সহ কোনোটিতে তিনি জড়িত না।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ