ঢাকা ৪ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২১শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৪:৪৬ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২, ২০২৬
একটি দীর্ঘ সময়, অসংখ্য মাঠ আর অগণিত স্মৃতিকে সঙ্গে নিয়ে বিদায় নিলেন রণজিত দাস। দেশের ক্রীড়াঙ্গনের এই বর্ষীয়ান ফুটবলার ও সংগঠক সোমবার সকাল ৬টা ৫৫ মিনিটে সিলেট নগরের তালতল এলাকার পার্কভিউ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর।
বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতায় দীর্ঘদিন ভুগছিলেন রণজিত দাস। সাম্প্রতিক সময়ে সর্দি ও শ্বাসকষ্টের সমস্যা বেড়ে গেলে শনিবার তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই জীবনের দীর্ঘ ইনিংসের ইতি টানেন তিনি।
পারিবারিক সূত্র জানায়, তাঁর মরদেহ আজ নগরের করেরপাড়া এলাকার বাসভবনে নেওয়া হবে। সন্ধ্যার পর সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাবেন ক্রীড়াঙ্গনের সহযাত্রী, শিষ্য ও শুভানুধ্যায়ীরা। পরে চালিবন্দর এলাকার শশ্মানে সম্পন্ন হবে শেষকৃত্য।
১৯৩২ সালের ২৯ অক্টোবর সিলেট শহরের জিন্দাবাজার কুড়িটুলা এলাকায় জন্ম নেওয়া রণজিত দাস ছিলেন সেই প্রজন্মের প্রতিনিধি, যাঁদের হাতে গড়ে উঠেছিল এ অঞ্চলের সংগঠিত ক্রীড়াচর্চা। পেশায় ব্যাংক কর্মকর্তা হলেও খেলাধুলাই ছিল তাঁর জীবনের প্রধান পরিচয়। ফুটবল মাঠে গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে যেমন ভরসার নাম ছিলেন, তেমনি হকি ও ক্রিকেটেও ছিল তাঁর দৃপ্ত উপস্থিতি।
পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে পূর্ব পাকিস্তান ফুটবল দলের গোলকিপার হিসেবে তিনি জাতীয় পর্যায়ে নিয়মিত প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯৫৫ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি দুবার নেতৃত্ব দেন পূর্ব পাকিস্তান দলকে অধিনায়ক হিসেবে। ঢাকার প্রথম বিভাগ ফুটবল লিগে তাঁর খেলোয়াড়ি নৈপুণ্য বিশেষভাবে আলোচিত ছিল। ১৯৫৭ সালে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে খেলার মধ্য দিয়ে তাঁর ক্রীড়াজীবনে যুক্ত হয় আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায়।
ফুটবলের পাশাপাশি হকিতেও রণজিত দাস রেখে গেছেন নিজের ছাপ। ১৯৬৫ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান জাতীয় হকি দলের সদস্য হিসেবে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেন তিনি। ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান হকি দল এবং প্রথম বিভাগ হকি লিগেও নিয়মিত খেলেছেন এই বহুমুখী ক্রীড়াবিদ।
খেলোয়াড়ি অধ্যায় শেষে তিনি নিজেকে উৎসর্গ করেন ক্রীড়াসংগঠনের কাজে। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন ঢাকার প্রতিষ্ঠাতা যুগ্ম সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন ছাড়াও পূর্ব পাকিস্তান স্পোর্টস ফেডারেশন ঢাকার নির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি। আজাদ স্পোর্টিং ক্লাবের ফুটবল সম্পাদক ও কোচ এবং পূর্ব পাকিস্তান যুব ফুটবল দলের কোচ হিসেবে বহু তরুণ খেলোয়াড়ের হাতে তুলে দিয়েছেন দিকনির্দেশনা।
ক্রীড়াঙ্গনে দীর্ঘ ও নিষ্ঠাবান অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৭ সালে রণজিত দাস লাভ করেন জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার। এ ছাড়া প্রথম আলো-গ্রামীণফোন আজীবন সম্মাননা, ‘৫০–৬০ দশকের কৃতী ফুটবলার’ সম্মাননাসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সংবর্ধনায় ভূষিত হয়েছেন তিনি। ২০২৫ সালে প্রকাশিত তাঁর স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ ‘ক্রীড়াঙ্গনের ফেলে আসা দিনগুলো’ দেশের ক্রীড়ার ইতিহাসে এক মূল্যবান দলিল হয়ে থাকবে।
রণজিত দাসের মৃত্যুতে ক্রীড়াঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোক। তিনি স্ত্রী, চার কন্যা ও এক পুত্র রেখে গেছেন। মাঠে তাঁর দৃঢ় অবস্থান আর মাঠের বাইরে তাঁর নীরব অবদান—দুটোই ক্রীড়াঙ্গনের স্মৃতিতে দীর্ঘদিন উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।
Design and developed by sylhetalltimenews.com