ঢাকা ১৪ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১০:৩৮ পূর্বাহ্ণ, মে ১৪, ২০২৬
আলহামদুলিল্লাহ। ফিরে পেলাম নতুন ভোর
আলহামদুলিল্লাহ—সকল প্রশংসা মহান রবের জন্য। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে তাঁর রহমতই আমাদের আশ্রয়।
গণমাধ্যমে প্রায়ই চোখে পড়ে অদ্ভুত অথচ ভয়াবহ সব সংবাদ, গলায় লিচুর বিচি আটকে নিঃশ্বাসরোধ, চকোলেটের টুকরো হয়ে ওঠে মৃত্যুর দূত, কিংবা মাছের কাঁটা বিদ্ধ হয়ে নিথর হয়ে যায় জীবন। একজন সংবাদকর্মী হিসেবে এসব খবর আমার চোখে বারবার ধরা দেয়, আর প্রতিবারই মনে হয় যেন গলার ভেতর অচেনা আতঙ্ক ঢুকে বসে আছে।
বছর খানেক আগে আমার এক পরিচিতজন পাখির মাংসের কাঁটা গলায় আটকে প্রাণ হারিয়েছিলেন। সেই স্মৃতি আজও আমাকে শিউরে তোলে। প্রতিটি এমন সংবাদ যেন মনে করিয়ে দেয়—জীবন কতটা ভঙ্গুর, কতটা অনিশ্চিত।
কিন্তু এবার সেই ভয়াবহতা এসে ছুঁয়ে গেল আমার নিজের জীবনকে। গলার ভেতর আটকে গেল কৃত্রিমদাঁত, এক মুহূর্তে মনে হলো নিঃশ্বাস যেন থেমে যাবে, অন্ধকার গ্রাস করবে চারপাশ। আতঙ্কের সেই মুহূর্তে বুঝলাম, মৃত্যুর ছায়া কতটা কাছে ঘুরে বেড়ায় আমাদের চারপাশে।
জীবন আসলে এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা;
একটি বিচি, একটি কাঁটা, কিংবা একটি দাঁতই পারে সেই সুতো ছিঁড়ে দিতে। আর আমরা প্রতিদিন সংবাদে পড়ি, দেখি, লিখি—কিন্তু যখন সেই বিপদ নিজের গলায় এসে দাঁড়ায়, তখনই বোঝা যায় ভয়ের আসল রূপ।
এবার আসি মূল কথায়-
রাতের নীরবতায় দাঁত ব্রাশ করার সেই চিরচেনা রুটিন হঠাৎই রূপ নিল ভয়াবহ বিপদে।
দাঁতের সমস্যা আমার বহু পুরনো; বলতে গেলে মায়ের কাছ থেকেই পাওয়া। তার ওপর কিশোর বয়সে টিউবওয়েলের হাতল চাপতে গিয়ে পড়ে সামনের চারটি দাঁত ভেঙে গিয়েছিল। সেই থেকে কৃত্রিম দাঁত নিয়েই চলছি। বছরের পর বছর এই উপরি দাঁতগুলো মুখের সঙ্গে এমনভাবে মিলে গেছে যে আলাদা করে টেরও পাওয়া যায় না।
আর সেই থেকে কৃত্রিম দাঁতের সঙ্গে পথচলা; সবই যেন জীবনের অংশ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মঙ্গলবার রাতে হঠাৎ ভেঙে যাওয়া দাঁত গলার গভীরে ঢুকে গেল তিন ইঞ্চি পরিমাণ। শ্বাসরুদ্ধকর আতঙ্কে মনে হচ্ছিল জীবন যেন থেমে যাবে।
স্ত্রী বললেন হাসপাতালে যেতে, ভাগ্না ছুটে এল খবর শুনে। তাদের তাগিদে ছুটলাম ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দিকে।
পথে এনজেল ইএনটি হাসপাতালে খবর নিতে বললাম ভাগ্নাকে। ভাগ্না অয়ন এসে জানাল-ডা. নুরুল হুদা নাঈম আছেন। সেই মুহূর্তে মনে যেন আলো জ্বলে উঠল। মনে অনেকটা সাহস পেলাম।
রিসিপশনের আনুষ্ঠানিকতা শেষে চারতলায় অপেক্ষা। কিছুক্ষণ পর ডা. নাঈমের সামনে দাঁড়ালাম। তাঁর শান্ত কণ্ঠে ভরসার কথা শুনে আবারও মনে সাহস ফিরে এল। তিনি বললেন, আপনার কিচ্ছু হয়নি, “চিন্তার কিছু নেই, সব ঠিক হয়ে যাবে।” তার এই বাক্য যেন অন্ধকারে জ্বেলে দিল আশার প্রদীপ।
অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হল। এন্ডোস্কোপির পাইপ মুখে প্রবেশ করানো হল। কয়েকবার চেষ্টা, ব্যর্থতা, আবার চেষ্টা। যদি বের না হয় তাহলে ভেতরে ঠেলে দেওয়ার কথাও জানালেন ডা. নাঈম। অবশেষে সফলতা; গলার ভেতর থেকে বেরিয়ে এল সেই বিপজ্জনক বস্তু। মন ভরে উঠল কৃতজ্ঞতায়। আবারও শুকরিয়া মহান রবের দরবারে।
এবার আসি ডা. নুরুল হুদা নাঈম প্রসঙ্গে। তার সঙ্গে পরিচয় বেশ আগের। আমার অনেক রোগীর প্রিয় চিকিৎসক তিনি। নিজেও এক দুবার গেছি চিকিৎসার জন্য। এবার যেতে হয়েছে নিজের ভয়াবহ বিপদে। গভীর রাতে। আর এই বিপদে তাকে এভাবে গভীর রাতে কাছে পাব কল্পনাও করতে পারিনি। ডা. নুরুল হুদা নাঈম নিজে পাশে থেকে সাহস যুগিয়েছেন তা-ও কল্পনার বাইরে। যেভাবে ভেতরে থাকা বস্তটি তিনি নিয়ে আসলেন মহান রবের কাছে তার জন্য প্রার্থনা করছি তিনি যেন তাকে নেক হায়াত দেন। সুস্থতার জিন্দেগী দেন।
এই বিপদের রাতে তাঁর সাহচর্য আমাকে দিয়েছিল এক প্রশান্তির ছোয়া। ভয়াবহ বিপদে আমার কাছে মনে হয়েছে তিনি শুধু চিকিৎসক নন, তিনি সাহসের প্রতীক। আল্লাহ তায়ায়ালার অশেষ কৃপায়, আল্লাহ তায়ালার অশেষ রহমতে; তাঁর হাতের দক্ষতায়, তাঁর মানবিকতায় আমি ফিরে পেলাম নতুন এক জীবন।
আজও মনে হয়; মানবতার গল্প আসলে এমনই। যেখানে একজন চিকিৎসকের দায়িত্ববোধ, পরিবারের স্বজনদের ছুটে আসা, একজন স্ত্রীর উদ্বেগ; সব মিলেই গড়ে ওঠে জীবনের সুরক্ষা। আর সেই সুরক্ষার আড়ালে থাকে মহান রবের অশেষ রহমত।
তারপরও মানুষ আসলে কত বোঝা বুকে নিয়ে বাঁচে। আমাদের চারপাশে কত বন্ধু, কত পরিচতজনের হার্টে বসানো রিং, কারও বুকে পেসমেকারের নীরব স্পন্দন। কেউ কিডনি প্রতিস্থাপন করে নতুন জীবনের আশায় দিন গুনছে, কারও ফুসফুস প্রায় নিঃশেষ হয়ে গেছে। দুর্ঘটনায় কেউ হারিয়েছে অঙ্গ, তবু জীবনকে আঁকড়ে ধরে আছেন কোনো রকমে।
জীবন যেন এক অন্তহীন সংগ্রাম; যেখানে প্রতিটি শ্বাসই একেকটি জয়, প্রতিটি দিনই একেকটি লড়াই। হয়তো এভাবেই আমাদের পথ চলতে হবে, ক্ষত-বিক্ষত শরীর নিয়ে, তবু অদম্য মনোবলকে সঙ্গী করে।
আজ ভোরে জানালার পাশে বসে আমি তাকালাম আকাশের দিকে। চারপাশে মেঘের চাদর, মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকানি যেন অন্ধকারকে ছিঁড়ে আলোর রেখা আঁকছে। দূরে পাখির ডাক ভোরের নীরবতাকে ভেঙে দিল, আর সেই মুহূর্তে মনে হল—পৃথিবী আসলেই কত সুন্দর।
কিন্তু সৌন্দর্যের ভেতরেও জেগে উঠল গত রাতের স্মৃতি। কত মানুষ ছিল সেই রাতের ছায়ায়; একজন স্ত্রীর দৃঢ় সিদ্ধান্ত, একজন ডাক্তারের নিপুণ হাত। সব মিলিয়ে এক জীবন ফিরে পেল তার শ্বাস। আর সেই জীবন বেঁচে থাকার কারণেই আজ আমি দেখছি নতুন ভোরের আলো।
মহান রবের দরবারে
লক্ষ কোটি শুকরিয়া আলহামদুলিল্লাহ।
—জীবন যেন আবারও নতুন করে শুরু হলো। সকলের দোয়া প্রত্যাশী।
লেখক : সাংবাদিক ফয়সল আহমদ বাবলু।
সমকাল:সিলেট।
Design and developed by sylhetalltimenews.com