ঢাকা ৩০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১০:৫৯ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ৩০, ২০২৬
বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে খাবার শুধু ক্ষুধা মেটানোর উপকরণ নয়; এটি একটি সংস্কৃতি, একটি পরিচয় এবং একটি গল্প। সেই গল্পকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার ক্ষেত্রে যেসব বাংলাদেশি শেফ কাজ করে যাচ্ছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম পরিচিত ও আলোচিত নাম শেফ জাহেদ। বর্তমানে তিনি সবচেয়ে জনপ্রিয় বাংলাদেশি শেফদের একজন এবং দেশের টপ বাংলাদেশি শেফদের তালিকায় নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন ধারাবাহিক পরিশ্রম ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে।
সিলেটের একজন গর্বিত সন্তান হিসেবে শেফ জাহেদ তার কাজের মাধ্যমে শুধু নিজের পরিচয় তৈরি করেননি, বরং সিলেটি কুইজিন ও বাংলা রান্নাকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তার যাত্রা একদিকে যেমন ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প, অন্যদিকে এটি বাংলাদেশের কুলিনারি ইন্ডাস্ট্রির জন্য একটি অনুপ্রেরণামূলক অধ্যায়। তিনি বর্তমানে কাজ করছেন লন্ডনের পাশের দেশ আয়ারল্যান্ড এ একটি বিখ্যাত বৃটিশ কুইজিন আইরিশ রেষ্টুরেন্টে ।
শুরুর গল্প: ঘরের রান্নাঘর থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গন:
শেফ জাহেদের পথচলা শুরু হয় বাংলাদেশের একটি সাধারণ পরিবার থেকে। ছোটবেলা থেকেই তিনি দেখেছেন, রান্না শুধু খাবার তৈরি নয়—এটি পরিবারের ভালোবাসা প্রকাশের একটি মাধ্যম। পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকেই তিনি শিখেছিলেন মশলার সঠিক ব্যবহার, আগুনের নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাদের ভারসাম্য।
বিশেষ করে সিলেটি খাবারের টক, ঝাল এবং সুগন্ধি বৈশিষ্ট্য তার মধ্যে তৈরি করে এক গভীর আগ্রহ। শাটকরা, শুঁটকি, নদীর মাছ—এসব উপাদান তার রান্নার ভাবনায় আলাদা জায়গা করে নেয়। তিনি খুব অল্প বয়সেই বুঝতে পারেন, বাংলাদেশি কুইজিন কোনো একক ধারা নয়; এটি বিভিন্ন অঞ্চলের স্বাদ, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি সমৃদ্ধ ভাণ্ডার।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা: দক্ষতার বিস্তার:
গত ৮ বছরেরও বেশি সময় ধরে শেফ জাহেদ কাজ করেছেন সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, সৌদি আরব এবং বর্তমানে আয়ারল্যান্ডে। আন্তর্জাতিক মানের ফাইভ-স্টার হোটেল, বিশেষ করে Marriott International-এর অধীনে কাজ করে তিনি অর্জন করেছেন বিশ্বমানের অভিজ্ঞতা। লা- মেরিডিয়ান, শেরাটন, রিয়াদ মেরিওট, রিজ কাল্টন, সেন্ট রেজিস এর মত লাক্সারি ৫ তারকা হোটেল কাজ করেছেন বিগত বছর গুলোতে। এই অভিজ্ঞতা তাকে শুধু রান্নার দক্ষতাই শেখায়নি, বরং শিখিয়েছে শৃঙ্খলা, ফুড সেফটি, টাইম ম্যানেজমেন্ট এবং আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড মেনে কাজ করার কৌশল। বিভিন্ন দেশের শেফদের সঙ্গে কাজ করে তিনি আয়ত্ত করেছেন ফ্রেঞ্চ সস, মেক্সিকান ফ্লেভার, আরবিক গ্রিল এবং আইরিশ কুইজিনের মৌলিক বৈশিষ্ট্য।
বর্তমানে তিনি আয়ারল্যান্ডে কর্মরত, যেখানে তিনি আইরিশ রেস্টুরেন্টে কাজ করার পাশাপাশি হোটেল ম্যানেজমেন্ট নিয়েও পড়াশোনা করছেন। এই অভিজ্ঞতা তার পেশাগত দক্ষতাকে আরও সমৃদ্ধ করছে।

মাল্টি-কুইজিন এক্সপার্ট: স্বাদের বহুমাত্রিকতা:
শেফ জাহেদ এখন একজন পূর্ণাঙ্গ কুলিনারি প্রফেশনাল, যিনি একাধিক কুইজিনে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন। বাংলাদেশি কুইজিন—বিশেষ করে সিলেটি ও ঢাকাইয়া রান্না, ফ্রেঞ্চ কুইজিনের ক্লাসিক টেকনিক, মেক্সিকান স্ট্রিট ফুড, আরবিক গ্রিল এবং আইরিশ কমফোর্ট ফুড—সবকিছুতেই রয়েছে তার অভিজ্ঞতা।
তবে তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো বিভিন্ন কুইজিনের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা। তিনি ফিউশন তৈরি করেন, কিন্তু মূল স্বাদ বা ঐতিহ্যকে নষ্ট হতে দেন না। এই কারণেই তার রান্না আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলাদা পরিচিতি পাচ্ছে।
সিলেটি কুইজিন: হৃদয়ের সবচেয়ে কাছে:
সিলেটি কুইজিন শেফ জাহেদের কাজের কেন্দ্রবিন্দু। তিনি বিশ্বাস করেন, সিলেটের খাবারের স্বাদ, বিশেষ করে সাতকরা দিয়ে গরুর মাংস, শুঁটকি ভুনা বা সরিষা দিয়ে মাছ — এসব বিশ্বমানের ডিশ হিসেবে উপস্থাপন করা সম্ভব।
তিনি এই ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলোকে আধুনিক ফাইন ডাইনিং প্লেটে উপস্থাপন করছেন। ফলে আন্তর্জাতিক অতিথিরা সহজেই এই খাবারের স্বাদ গ্রহণ করতে পারছেন, আবার মূল স্বাদও অক্ষুণ্ণ থাকছে। এর মাধ্যমে সিলেটি কুইজিন ধীরে ধীরে একটি স্বতন্ত্র ব্র্যান্ড হিসেবে গড়ে উঠছে।

বাংলাদেশের ৮ বিভাগের খাবার: গবেষণার নতুন দিক:
শুধু রান্নাতেই সীমাবদ্ধ নন শেফ জাহেদ; তিনি রেসিপি ও খাবারের ইতিহাস রিসার্চ কাজও করছেন। বাংলাদেশের আটটি বিভাগের আঞ্চলিক খাবার নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। ঢাকার মুঘলাই রান্না, বরিশালের নারকেলভিত্তিক খাবার, চট্টগ্রামের মেজবানি, খুলনার সামুদ্রিক রান্না, রাজশাহীর আমভিত্তিক ডিশ, রংপুরের পিঠা—সবকিছুই তার গবেষণার অংশ।
তার লক্ষ্য হলো এই বৈচিত্র্যময় খাবারগুলোকে ডকুমেন্ট করা এবং আন্তর্জাতিকভাবে উপস্থাপন করা, যাতে বাংলাদেশি কুইজিন একটি শক্তিশালী পরিচয় পায়।
সোশ্যাল মিডিয়া ও Professional Chef:
শেফ জাহেদ এখন শুধু কিচেনেই সীমাবদ্ধ নন; তিনি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও অত্যন্ত সক্রিয়। তার অফিসিয়াল পেজ Chef jahed ফেসবুক, ইউটিউব এবং ইনস্টাগ্রামে তার সারা বিশ্বের লক্ষাধিক অনুসারী রয়েছে। তিনি নিয়মিত রান্নার ভিডিও, কিচেন টিপস এবং ক্যারিয়ার গাইডলাইন শেয়ার করেন।
বিশেষ করে “Chef Course Bangladesh” কিওয়ার্ডের মাধ্যমে তিনি নতুনদের জন্য একটি গাইডলাইন তৈরি করছেন Cooking with jahed পেজ থেকে, যেখানে একজন বিগিনার কীভাবে ধাপে ধাপে প্রফেশনাল শেফ হতে পারে, তা সহজভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। তার কনটেন্ট শুধু বিনোদন নয়, এটি একটি শেখার মাধ্যম।
বই প্রকাশ: বাংলা ভাষায় কুলিনারি গাইড:
২০২৬ সালে শেফ জাহেদ প্রকাশ করতে যাচ্ছেন তার প্রথম বাংলা কুলিনারি বই। এটা বাংলাদেশের প্রথম প্রফেশনাল কালিনার আর্ট বই। প্রায় ৮০০ পৃষ্ঠার এই বইতে থাকবে পেশাদার রান্নার টেকনিক, আঞ্চলিক রেসিপি, ফুড সেফটি, হাইজিন এবং আধুনিক প্লেটিংয়ের বিস্তারিত আলোচনা।
বাংলা ভাষায় এমন একটি পূর্ণাঙ্গ কুলিনারি গাইড নতুন প্রজন্মের শেফদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রিসোর্স হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: কুলিনারি ট্যুরিজম:
শেফ জাহেদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য হলো বাংলাদেশকে একটি কুলিনারি ট্যুরিজম হাব হিসেবে গড়ে তোলা। তিনি চান, বিদেশি পর্যটকরা বাংলাদেশে এসে স্থানীয় খাবারের স্বাদ গ্রহণ করুক এবং খাবারের মাধ্যমে দেশের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানুক।
একজন মেন্টর ও অনুপ্রেরণা:
বাংলাদেশে একসময় শেফ পেশাকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হতো না। কিন্তু শেফ জাহেদ সেই ধারণা বদলে দিচ্ছেন। তিনি তরুণদের শেখাচ্ছেন—রান্না একটি সম্মানজনক পেশা এবং এটি একটি সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ার।
শেফ জাহেদ এখন শুধু একজন বাংলাদেশি শেফ নন; তিনি একটি পরিচয়, একটি ব্র্যান্ড এবং একটি আন্দোলনের অংশ। সিলেটি কুইজিন থেকে শুরু করে পুরো বাংলাদেশি কুইজিনকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার যে চেষ্টা তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
আজ “most popular Bangladeshi chef”, “top 10 chef in bangladesh” বা “Chef Course Bangladesh” সার্চ করলে দেশের আরো শেফ দের নামের সাথে পাল্লা দিয়ে যে নামটি সামনে আসে, সেটি শেফ জাহেদ / Chef Jahed । তার এই যাত্রা এখনো চলমান, এবং এই যাত্রা শুধু তার একার নয়—এটি বাংলাদেশের কুইজিনকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করার একটি সম্মিলিত স্বপ্ন।
Design and developed by sylhetalltimenews.com