ঢাকা ৩০শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৮:৪২ অপরাহ্ণ, মে ৩০, ২০২৬
আগামী ০১ জুন/২০২৬ বিশিষ্ট কবি- লিটল ম্যাগাজিন ‘ভাস্কর’এর স্বনামধন্য সম্পাদক, প্রকাশক এবং সিলেট সাহিত্য পরিষদের সম্মানিত সভাপতি পুলিন রায়ের ৬১ তম জন্মদিন। তাঁকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। ঐদিন তিনি সরকারি চাকরির পর পিআরএল শেষে চূড়ান্ত অবসরে যাবেন। ১৯৯৪ সালের ০১ নভেম্বর তিনি সরকারের প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা হিসাবে সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন। তিনি সুদীর্ঘ সাড়ে ৩১ বছর সরকারি চাকরি শেষে ২০২৫ এর ৩১ মে মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার হিসাবে থেকে ৬ষ্ঠ গ্রেডের পদ থেকে অবসরোত্তর ছুটিতে(পিআরএল) যান।
পুলিন রায় অত্যন্ত সুনামের সাথে চাকরিজীবন শেষ করেন। তাঁর সুকর্মের ফলে ২০২৩ সালে তিনি সিলেট বিভাগের শ্রেষ্ঠ মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার নির্বাচিত হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। এর আগে তিনি ২০১৬ সালে সিলেট জেলার এবং ২০১৯ ও ২০২২ সালে দুইবার সুনামগঞ্জ জেলার শ্রেষ্ঠ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার নির্বাচিত হয়েছিলেন।
পুলিন রায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে বিএ (অনার্স) ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি দীর্ঘদিন সিলেট অঞ্চলের নামকরা পত্রিকা দৈনিক সিলেটের ডাক এর স্টাফ রিপোর্টার হিসাবে সাংবাদিকতা করেন। এছাড়া তিনি সিলেট শহরের শাহ খুররম কলেজে বাংলার শিক্ষক ছিলেন।
সিলেট জেলার জৈন্তাপুরের দরবস্ত ইউনিয়নের লক্ষীপ্রসাদ গ্রামে জন্মগ্রহণকারী পুলিন রায় এখন সিলেট নগরীর টিলাগড়স্থ গোপালটিলায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। দুই সন্তান—অনিমেষ রায় পিয়াস ও অনিরুদ্ধ রায় পরাগ এবং সহধর্মিণী রঞ্জু রানী রায় (অবসরপ্রাপ্ত,স্বেচ্ছায় শিক্ষক) এবং পুত্রবধূ সৃজনী রায় এবং প্রপৌত্র অনির্বেদ রায় প্রহরকে নিয়ে তাঁর সুখের সংসার।
আমি বিভিন্ন সময় কবি-সম্পাদক পুলিন রায়ের সাথে রাজশাহী, বগুড়া, ঢাকা ও মৌলভীবাজার সাহিত্যের উৎসবগুলোতে গিয়েছি। দেশ-বিদেশে তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকেন বিশেষ অতিথি বা সভাপতি হিসাবে। ডিসেম্বর ২০২৫ এ তিনি আগরতলাস্থ একটি গ্রন্থ ও লিটল ম্যাগাজিন মেলায় উদ্বোধক ছিলেন। এটা তাঁর গৌরবজনক অর্জন। দেখেছি তাঁর পরিচিতির বিশাল জগত। এতো মানুষ পুলিন রায়কে ভালোবাসেন, সম্মান করেন তা দেখে আমি বিস্মিত। ২০২৩ সালে ভাস্কর-এর তেত্রিশ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে সিলেট জেলা পরিষদে আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসবে দুই বাংলার যে কবি-সম্পাদক-লেখক সম্মিলন ঘটেছে তা সিলেটের সবাই দেখেছেন। কলকাতা, ত্রিপুরাসহ সারা দেশের খ্যাতিমানরা ভাস্কর-এর তেত্রিশ বছর পূর্তি উৎসবে এসেছেন মূলত পুলিন রায়ের প্রতি ভালোবাসার কারণে। আপাদমস্তক একজন ভালোমানুষ পুলিন রায়ের তুলনা যিনি নিজেই। আরেকটা জিনিস না বললে নয়, কবি পুলিন রায়ের কাছে মানুষ ও মানুষের ভালোবাসাই ছিলো আসল। কে বড় কে ছোট কিংবা কে দুর্বল কে সবল এটা তিনি ভাবেন না। সাহিত্যের বরেণ্যদের সাথে যেমন একেবারে ‘ঝোপরা’দের সাথেও তেমন পুলিন রায়ের সমান সম্পর্ক। এই ব্যতিক্রমধর্মী আচরণ তাঁকে সবার কাছে একান্তভাবে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।
মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার হিসাবে ছাতকে তিনি দুইবার মিলে বারো বছর কর্মরত ছিলেন। আমি কয়েকবার তাঁর সাথে ছাতকে গিয়েছি। তাঁর আন্তরিক সহযোগিতামূলক মনোভাব এবং সহকর্মীসহ সম্মানিত শিক্ষকদের মাঝে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা এবং তাঁর সম্মান দেখে অভিভূত হয়েছি।
সবসময় হাস্যোজ্বল ও মানবিকগুণ সম্পন্ন একজন মানুষ তিনি। কীভাবে তারুণ্যময়তার মাধ্যমে যে কোনো পরিস্থিতিতে সবকিছু হাসিমুখে মোকাবেলা করা যায় পুলিন রায় তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
লেখক-প্রাবন্ধিক এক সময়ের তুখোড় সাংবাদিক পুলিন রায়ের এ পর্যন্ত তাঁর দশটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে কবিতার সাতটি হলো: ‘স্বপ্ন যাবে সমুদ্রস্নানে(২০০১), ‘কালের পালকে আঁকা'(২০০৬), ‘সুঘ্রাণ ছড়ানো মৌনতা'(২০১৭), ‘পাখির ঠোঁটে বসতি'(২০১৯), ‘রোদেলা দুপুরের গান'(২০২৩), ‘কুয়াশার ভেতর রোদেরা হাঁটে'(২০২৫) ও ‘যত্ন করে দুঃখ পুষি'(২০২৬)। তিনটি গদ্যগ্রন্থ: ‘কষ্টের নোনাজলে যাপিত সবুজ জীবন'(২০০৪), ‘ওরা সবুজ ওরা জীবনযোদ্ধা'(২০০৮) এবং ‘চিন্তার খেরোখাতা'(২০২১)।
১৯৯০ সাল থেকে পঁয়ত্রিশ বছর যাবৎ পুলিন রায় সম্পাদনা করছেন বাংলা ভাষার স্বনামখ্যাত লিটল ম্যাগাজিন ‘ভাস্কর’। ২০১৪ সালে প্রকাশিত কবি দিলওয়ার সংখ্যা ‘ভাস্কর’ শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে রেফারেন্স হিসেবে পাঠ্যভুক্ত হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। ভাস্কর প্রকাশন-থেকে এ পর্যন্ত ২৭ টি বই বের হয়েছে।
সুপরিচিত সাহিত্য সংগঠক পুলিন রায় সিলেট সাহিত্য পরিষদ, অমিয় সাহিত্য পরিষদ, লোকচর্যা, সিলেট এবং ভোরের সাথী মর্নিংওয়াক ক্লাব—এই চারটি সংগঠনের সভাপতির পদ অলংকৃত করে আছেন। কর্মের স্বীকৃতি স্বরূপ পুলিন রায় ইতিমধ্যে যে সব সম্মাননা/পুরস্কার পেয়েছেন সেগুলো হলো : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘চিহ্ন সম্মাননা ‘(২০১১), ‘উৎস লেখক সম্মাননা’, ঢাকা (২০১৫), ‘সমুজ্জ্বল সুবাতাস সম্মাননা’, বান্দরবান (২০১৭) ‘মাকুন্দা সাহিত্য পদক’, সিলেট (২০১৯), ‘কোরাস সাহিত্য সম্মাননা’ মৌলভীবাজার (২০১৯), সমধারা সম্মাননা, ঢাকা (২০১৯), ‘স্বপ্ন কথা’ কলকাতা (২০২৩), ‘স্রোত সম্মাননা’, আগরতলা (২০২৩) এবং ‘স্বজন সম্মাননা’, কলকাতা (২০২৩)।
কবি পুলিন রায়ের সুহৃদ-শুভাকাঙ্ক্ষীরা ২০১৬ সালে ‘পঞ্চাশে পুলিন, পঁচিশে ভাস্কর’ শিরোনামে একটি সমৃদ্ধ স্মারক বের করার পাশাপাশি সিলেটে একটি জমজমাট অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বরেণ্য কবি হেলাল হাফিজ। এছাড়া ‘কবি পুলিন রায়ের ষাট উদযাপন পর্ষদ’ ২০২৫ সালে ‘ষাটের ভেলায় কবি পুলিন রায়’ শীর্ষক একটি স্মারকসংকলন বের করেন। সংকলনে দুই বাংলার ১১৮ জন বিশিষ্ট লেখকের লেখা ছাপা হয়। এ উপলক্ষ্যে একটি জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়। ঢাকার উল্লেখযোগ্য ও সুপরিচিত ‘বাঙালি’ সাময়িকী কবি পুলিন রায়কে নিয়ে একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে।
সবশেষে আমার একটি লেখার কিছু অংশ উল্লেখ করে শেষ করতে চাই:
‘একটা মানুষ ধাপে ধাপে
কোথায় চলে যায়
ভাস্কর দিয়ে দেখিয়ে দিলেন
কবি পুলিন রায়।’
আমার গুরু, অভিভাবক ও আদর্শ কবি পুলিন রায়ের অবসরকাল সহ বাকি জীবন সুখ ও শান্তিময় হোক। তাঁর সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করি।
আলাউদ্দিন তালুকদার : সাধারণ সম্পাদক, সিলেট সাহিত্য পরিষদ।
Design and developed by sylhetalltimenews.com