সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা কি সত্যিই এত কঠিন?

প্রকাশিত: ৯:২৪ অপরাহ্ণ, জুলাই ১২, ২০২৬

সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা কি সত্যিই এত কঠিন?

Manual1 Ad Code

সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা কি সত্যিই এত কঠিন?

কলমে: এম টি এম সুজন:

 

সময়—এই ছোট্ট শব্দটির ভেতর লুকিয়ে আছে মহাবিশ্বের সবচেয়ে গভীর সত্য। সময়ের কোনো মুখ নেই, কোনো রঙ নেই, কোনো ভাষা নেই; তবুও তারই স্পর্শে পৃথিবীর প্রতিটি দৃশ্য বদলে যায়। শিশুর প্রথম কান্না থেকে বৃদ্ধের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ের নীরব সাক্ষী সময়। সে কখনো কারও জন্য অপেক্ষা করে না, আবার কাউকে ইচ্ছাকৃতভাবে পিছিয়েও দেয় না। সে কেবল নিজের নিয়মে এগিয়ে চলে। যে তার গতি বুঝতে শেখে, সে জীবনকে বুঝতে শেখে; আর যে সময়কে অস্বীকার করে, সে ধীরে ধীরে নিজের অস্তিত্বকেই সংকুচিত করে ফেলে।

 

মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো—সে পরিবর্তনকে সহজে মেনে নিতে পারে না। পরিচিত পথ, পরিচিত মানুষ, পরিচিত অভ্যাস এবং পরিচিত পৃথিবীর ভেতরেই সে নিরাপত্তা খুঁজে পায়। অথচ জীবন নিরাপত্তার নয়, পরিবর্তনের আরেক নাম। আজ যে শিশুটি মায়ের আঙুল ধরে হাঁটতে শেখে, একদিন সেই শিশুই সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয়। যে তরুণ স্বপ্ন দেখে, একদিন সেই স্বপ্নের মূল্য দিতে হয় ঘাম, শ্রম, ত্যাগ আর অশ্রু দিয়ে। এভাবেই সময় মানুষকে প্রতিটি বয়সে নতুন পরিচয় দেয়।

 

তবু আমরা প্রায়ই বলি—“আগের দিনগুলোই ভালো ছিল।” হয়তো ছিল। কিন্তু সেই ভালো সময়ও একদিন বর্তমান ছিল। তখনও মানুষ ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছিল। তাই অতীতকে ভালোবাসা সুন্দর, কিন্তু অতীতেই বাস করতে চাওয়া জীবনের প্রতি অবিচার। কারণ সময়ের নদী কখনো উল্টো দিকে বয়ে যায় না।

 

প্রকৃতি প্রতিদিন আমাদের একটি অসাধারণ শিক্ষা দেয়। একটি বীজ যদি মাটির অন্ধকার ভেদ করার সাহস না পেত, তবে কখনো বিশাল বৃক্ষে পরিণত হতো না। একটি শুঁয়োপোকা যদি নিজের পুরোনো রূপ ছেড়ে বেরিয়ে আসতে না পারত, তবে রঙিন প্রজাপতির ডানা মেলতে পারত না। নদী যদি কেবল স্থির থাকতে চাইত, তবে সে কখনো সাগরের দেখা পেত না। প্রকৃতির প্রতিটি সৃষ্টি যেন নীরবে বলছে—বদলাতে শেখো, তবেই বিকশিত হবে।

Manual7 Ad Code

 

Manual7 Ad Code

সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা মানে শুধু নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করা নয়। এর অর্থ আরও গভীর। এর অর্থ নিজের ভুল স্বীকার করার সাহস অর্জন করা, নতুন জ্ঞানকে সাদরে গ্রহণ করা, সংকীর্ণতা ভেঙে বৃহত্তর মানবিকতায় পৌঁছানো। যে মানুষ প্রতিদিন কিছু না কিছু শেখে, সে কখনো বৃদ্ধ হয় না; তার বয়স বাড়ে, কিন্তু তার মন থাকে চিরতরুণ।

 

আজকের পৃথিবীতে জ্ঞান প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। যে দক্ষতা গতকাল মূল্যবান ছিল, আজ হয়তো তার নতুন রূপ এসেছে। তাই শিক্ষা কোনো নির্দিষ্ট বয়সে শেষ হয় না; শিক্ষা চলতে থাকে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত। যে শেখা বন্ধ করে দেয়, সে সময়ের কাছে নয়, নিজের কাছেই পরাজিত হয়।

 

জীবনের পথে ব্যর্থতা অবশ্যম্ভাবী। এমন মানুষ খুব কমই আছে, যার পথ কেবল সাফল্যের ফুলে সাজানো। অধিকাংশ মানুষের জীবনেই আছে হোঁচট, অপমান, প্রত্যাখ্যান, হারিয়ে ফেলা স্বপ্ন এবং নীরব কান্না। কিন্তু সময়ের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য এখানেই—সে কোনো দুঃখকে চিরস্থায়ী হতে দেয় না। অশ্রুও একদিন শুকিয়ে যায়, ক্ষতও একদিন দাগ হয়ে থাকে, আর সেই দাগই মানুষকে মনে করিয়ে দেয়—সে একদিন কঠিন সময় অতিক্রম করেছিল।

Manual7 Ad Code

 

আমরা অনেক সময় পরিবর্তনকে ভয় পাই, কারণ আমরা ফলাফল জানি না। কিন্তু অজানার ভয়ই তো নতুন আবিষ্কারের জন্ম দেয়। যদি মানুষ অজানাকে ভয় পেত, তবে সমুদ্র পাড়ি দিত না, আকাশে উড়তে শিখত না, মহাকাশে পৌঁছাত না। পৃথিবীর প্রতিটি বড় অর্জনের পেছনে ছিল সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলে নেওয়ার সাহস।

 

তবে একটি বিষয় কখনো ভুলে যাওয়া উচিত নয়—পরিবর্তন মানে নিজের চরিত্র, সততা কিংবা মূল্যবোধ বিসর্জন দেওয়া নয়। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার অর্থ হলো চিন্তায় আধুনিক হওয়া, কিন্তু বিবেকে অটল থাকা। কারণ যে পরিবর্তন মানুষকে মানবিকতা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, তা উন্নতি নয়; তা কেবল বাহ্যিক রূপান্তর।

 

মানুষের জীবনে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ অর্থ নয়, খ্যাতি নয়, বরং সময়। হারানো অর্থ ফিরে আসতে পারে, হারানো সম্মানও কখনো কখনো ফিরে আসে; কিন্তু হারানো সময় আর কোনো দিন ফিরে আসে না। তাই প্রতিটি মুহূর্তকে অর্থবহ করে তোলা আমাদের দায়িত্ব। একটি ভালো বই পড়া, নতুন কিছু শেখা, প্রিয়জনের পাশে থাকা, একজন অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটানো—এসবই সময়কে সম্মান করার সবচেয়ে সুন্দর উপায়।

 

একটি সমাজও তখনই এগিয়ে যায়, যখন তার মানুষ সময়ের প্রয়োজন বুঝতে শেখে। যারা অতীতকে সম্মান করে, বর্তমানকে কাজে লাগায় এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নেয়, তারাই ইতিহাস সৃষ্টি করে। আর যারা পরিবর্তনকে ভয় পায়, তারা ইতিহাসের পাতায় নয়, কেবল স্মৃতির পাতায় রয়ে যায়।

Manual1 Ad Code

 

শেষ পর্যন্ত জীবন আমাদের একটি কথাই শেখায়—সময় কারও শত্রু নয়, কারও বন্ধু নয়। সময় কেবল একটি আয়না। তুমি যেমন নিজেকে গড়ে তুলবে, সময় তোমাকে তেমনই প্রতিফলন ফিরিয়ে দেবে। তাই সময়ের সঙ্গে যুদ্ধ নয়, সময়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব করাই জীবনের সবচেয়ে বড় প্রজ্ঞা।

 

আজ যদি আমরা নিজেদের জিজ্ঞেস করি—সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা কি সত্যিই এত কঠিন?—তবে উত্তর হবে, পথটি সহজ নয়। কারণ এতে প্রয়োজন আত্মসমালোচনা, ধৈর্য, অধ্যবসায় এবং পরিবর্তনকে গ্রহণ করার সাহস। কিন্তু এই কঠিন পথেই লুকিয়ে আছে উন্নতির আলো, আত্মবিকাশের আনন্দ এবং একটি অর্থবহ জীবনের সম্ভাবনা।

 

সময়ের স্রোতে ভেসে যাওয়া সহজ; কিন্তু সময়ের ছন্দ বুঝে, নিজের বিবেক ও মূল্যবোধকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে চলাই একজন সত্যিকারের মানুষের পরিচয়। কারণ পৃথিবী শেষ পর্যন্ত তাদেরই মনে রাখে, যারা সময়ের পরিবর্তনকে ভয় না পেয়ে, তাকে সঙ্গী করে নিজেদের আলোকিত করেছে।